অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় শেষ গণটিকা কর্মসূচি
- আপলোড তারিখঃ
১৩-০৮-২০২১
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশে ৭ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া করোনার প্রথম ধাপের গণটিকাদান কর্মসূচি গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। এ সময়ে সরকারে স্বাস্থ্য বিভাগের টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ৩২ লাখ থাকলেও প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ টিকার আওতায় এসেছেন। তবে সপ্তাহব্যাপী এ কর্মসূচিতে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে টিকা গ্রহণকারী মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। গত এক সপ্তাহে সরেজমিন বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। টিকা গ্রহণকারীরা জানান, দেশে গত ৭ ফেব্রুয়ারি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের মাধ্যমে গণটিকাদান শুরু হওয়ার পর মাঝপথে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সংশয়ে ছিলেন। পরে সরকারের চেষ্টায় এ সংকট কেটে গেলেও অব্যবস্থাপনার কারণে টিকা নিতে গিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে মানুষকে চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভারত থেকে পাওয়া কোভিশিল্ডের টিকা প্রয়োগ নিয়ে শুরুতেই বাংলাদেশকে হোঁচট খেতে হয়েছে। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের পর গণটিকার আওতায় টিকা প্রদান ইতিবাচক দিক। এটা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কাজে দেবে। তবে ইতঃপূর্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দৈনিক ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও সেটি অর্জন করতে পারেনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক মাসে এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার ঘোষণার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এক সপ্তাহে এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। পরে সেটিও পরিবর্তন করে ৭ আগস্ট থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে গণটিকা কর্মসূচির আওতায় ১ কোটি ডোজ টিকা দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর আবারও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক সপ্তাহের পরিবর্তে মাত্র একদিন এ কর্মসূচি চলবে বলা জানায়। সর্বশেষ ৬ দিনে ৩২ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। টিকা প্রদানে সর্বনিম্ন ১৮ বছর বয়সসীমা থেকেও পিছিয়ে ২৫ বছর করা হয়। মূলত সূদরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জটিলতায় টিকাকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, টিকাদানের শুরুতে স্বাস্থ্য ও সরকারের অন্যান্য বিভাগ থেকে যে যেভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানোর দরকার ছিল তা যথেষ্ট হয়নি। ফলে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সাধারণ মানুষ গণটিকা পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেলেও টিকা দেওয়া হয়নি। টিকা দিতে কোথাও কোথাও চালু করা হয়েছে টোকেন পদ্ধতি। বয়স্ক ও অসুস্থদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও অনেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া টিকাকেন্দ্রের দীর্ঘ সারিতে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে কর্তৃপক্ষের তেমন উদ্যোগও দেখা যায়নি। এক কেন্দ্রে নিবন্ধন করে অন্য কেন্দ্রে গিয়েও টিকা নিয়েছেন অনেকে। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত টিকা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সংকটের দোহাই দিয়ে দুপুরের মধ্যে টিকা শেষ হয়েছে বলে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনও হয়েছে টিকার জন্য আগের দিন রাত থেকে সারিতে দাঁড়িয়ে পরের দিনও টিকা নিতে পারেননি। অনেকে আবার তদবিরের মাধ্যমে লাইনে না দাঁড়িয়েই টিকা পেয়েছেন।
কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা বলেন, টিকা নিতে ইচ্ছুক মানুষের সংখ্যার চেয়ে টিকার সরবরাহ কম হওয়ার কারণে সবাইকে টিকা দেওয়া যায়নি। প্রতিদিন মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ ডোজ টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে নারী ও পুরুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। আর কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে টিকা গ্রহীতারাই বেশি উদাসীন ছিল বলে মন্তব্য করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, মানুষকে টিকার আওতায় আনতে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে এটা খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই কর্মসূচিতে কত লোক আসবে, কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনা কেমন হবে সে ব্যাপারে পূর্ব পরিকল্পনায় কিছু ভুল ছিল। এটা নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা পরিকল্পনা দিয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। মূলত অনুমানে ভুল থাকার কারণে চাহিদা বাড়লেও টিকা সরবরাহ সম্ভব হয়নি। এখন সরকারের উচিত পরবর্তী কর্মসূচিতে যারা টিকা পাবেন তাদের আগে থেকেই নির্ধারণ করে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আগেই বাড়ি বাড়ি টোকেন পৌঁছে দেওয়া। তবে পরবর্তী কর্মসূচিতে প্রস্তুতির যেন ঘাটতি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। না হলে আগামীতেও এমন বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
করোনার টিকা নিতে গত ২৬ জানুয়ারি দেশে প্রথম নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি) থেকে জানা যায়, করোনাভাইরাসের টিকা নিতে সুরক্ষা অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে গিয়ে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ৩ কোটি ৪ লাখের বেশি মানুষ টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। আইসিটি বিভাগ কর্মকর্তারা বলছেন, ৭ আগস্ট সারাদেশে করোনার টিকাদানের সম্প্রসারিত কর্মসূচি শুরুর পর থেকে মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। ফলে নিবন্ধনের পরিমাণও বাড়েছে। এ কর্মসূচির শুরুর দিকে টিকার জন্য দৈনিক ৩০ লাখের মতোও নিবন্ধন হয়েছে। এর আগে টিকার মজুত কম আসায় ৮ জুন থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। জুনের শেষ দিকে আবার টিকার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হয়। ১৪ জুলাই টিকার জন্য এক কোটি নিবন্ধন ছাড়ায়। ৭ আগস্ট নিবন্ধন ছাড়ায় ২ কোটি। এখন দিনে প্রায় ১৫ লাখের মতো নিবন্ধন হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে অ্যাস্ট্রাজেনেকা, সিনোফার্ম, মডার্না ও ফাইজারের টিকা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশে মোট ২ কোটি ৮৯ হাজার ১০৭ প্রয়োগ করা হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত দেশের ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭১ হাজার ৬২০ জন করোনার টিকার আওতায় এসেছেন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ৫০ লাখ ২৩ হাজার ১৬২ জন। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ৯৪৫ জন।
কমেন্ট বক্স