মসজিদের মাইকে শুধু মৃত্যুর খবর!
- আপলোড তারিখঃ
৩০-০৭-২০২১
ইং
মেহেরপুরের দুটি গ্রামে গত এক মাসে ৪৫ জনের প্রাণহানি
মিজানুর রহমান জনি, মেহেরপুর:
গ্রামের কবরস্থানে গিয়ে দেখা মেলে এক সারিতে ২৪ জনের কবর। বাঁশের রেলিং দিয়ে ঘেরা কবরে চির সমাহিত গ্রামের বিভিন্ন বয়সী মানুষ। ভোরের দিকে মসজিদের মাইকে ভেসে আসা মৃত্যুর খবর গ্রামের মানুষের কানে যেন বেজেই যাচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে এই চিত্র দেখা যায়। একজনের মরদেহ দাফন সম্পন্ন করে বাড়ি ফেরার আগেই আরেকজনের মৃত্যুর খবর। গ্রামের ইতিহাসে এতো মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম। তাই ভীতি ছড়িয়েছে সকলের মনে। তবুও করোনা উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ থাকা মানুষের করোনা পরীক্ষা একেবারেই হচ্ছে না। নানা ধরনের গুজব, ভীতি আর অনীহায় করোনা পরীক্ষা থেকে দূরে সরে আছে প্রায় সবাই। এতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানালেন কয়েকজন সচেতন মানুষ। এচিত্র মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার জোড়পুকুরিয়া গ্রামের। একই উপজেলার গাড়াডোব গ্রামে গত এক মাসে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। এই উপজেলার দুই গ্রামেই গত একমাসে মারা গেছেন ৪৫ জন মানুষ। গ্রামের চিত্র এমন হলেও করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষের অচেতনতাকেই দায়ী করছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
জানা গেছে, জোড়পুকুরিয়া ও গাড়াডোব গ্রামে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত, বার্ধক্য, দীর্ঘদিনের রোগাক্রান্ত এবং কিছু মানুষের করোনা উপসর্গ ছিল। এছাড়াও বিপুল সংখ্যক মানুষের সর্দি, জ্বর ও করোনার অন্যান্য উপসর্গ থাকার পরেও পরীক্ষার আওতার বাইরে রয়েছেন।
জোড়পুকুরিয়া গ্রামের লিটন হোসেন জানান, প্রতিদিন অন্তত ৩০ জন মানুষ তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই করোনা উপসর্গ নিয়ে। জোর করেও এদেরকে করোনা পরীক্ষা করানো যাচ্ছে না বলে অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন এই পল্লী চিকিৎসক। তিনি বলেন, জোড়পুকুরিয়া ও আশেপাশের গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির মানুষেরই করোনা উপসর্গ আছে। পরীক্ষা করলে এদের মধ্যে ৮০ ভাগের রিপোর্ট পজিটিভ হবে।
জোড়পুকুরিয়া গ্রাম সূত্রে জানা গেছে, গেলো এক মাসে যে ২৪ জন মারা গেছেন তাদের মধ্যে একজন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকিদের কেউ করোনা পরীক্ষা করেননি। পরীক্ষা করা গেলে হয়তো এদের মধ্যে বেশিরভাগ করোনা পজিটিভ পাওয়া যেতো। এতো কিছুর পরেও গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানা ও করোনা পরীক্ষা না করতে নানা অজুহাত দেখাচ্ছে।
এদিকে জোড়পুকুরিয়া গ্রামের মতই একই চিত্র গাড়াডোব গ্রামের। গাড়াডোব গ্রামে মারা যাওয়া ২১ জনের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ছিলেন ৫ জন। বাকি যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের কারও পরীক্ষা হয়নি।
গাড়াডোব গ্রামের কয়েকজন জানান, করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও করোনা পরীক্ষা নিয়ে নানা ধরনের গুজবে ডুবে আছে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ। ফলে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ আক্রান্ত হলেও পরীক্ষা করানো যাচ্ছে না। সর্দি, জ্বরসহ করোনার অন্যান্য উপসর্গ থাকা কেউ যখন অক্সিজেন সংকটে পড়ছেন, তখন তাকে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে, যারা বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তাদেরকেই কেবল হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিতেই অভ্যস্ত।
মেহেরপুর সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দীন বলেন, ঠাণ্ডা কাঁশি যাদের হচ্ছে তারা যদি সচেতন হয় তাহলে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে আসতে হবে। প্রয়োজনে টেস্ট করাতে হবে। তবে অনেকে তথ্য গোপন করছে বিধায় অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
কমেন্ট বক্স