সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২৪ ঘন্টায় দেশে ১৪৩ জনের মৃত্যু
- আপলোড তারিখঃ
০২-০৭-২০২১
ইং
করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গায় আরও ২১ জনের মৃত্যু
জেলায় নতুন আক্রান্ত ৯৪ জনের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরেই ৪২, কপালে চিন্তার ভাজ!
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশ জুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে বৈশিক মহামারি করোনাভাইরাস। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৪৩ জনের। এটাই দেশে একদিনে করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যু। একই সময়ে সারা দেশে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৮ হাজার ৩০১ জনের শরীরে। এদিকে, গতকাল চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্র্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলাতেই ৪২ জনসহ জেলায় নতুন করে ৯৪ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া২৪ ঘন্টায় মেহেরপুরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৭ জন। অন্যদিকে গতকাল ঝিনাইদহে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। আর নতুন আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৯৭ জন।
চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে বেড়েই চলেছে মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপ। গতকাল জেলায় নতুন করে আরও ৯৪ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গতকাল জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষিত চুয়াডাঙ্গার ২৫৯টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে। এর মধ্যে ৯৪টি নমুনার ফলাফল পজিটিভ ও ১৬৫টি নমুনার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। জেলায় নতুন আক্রান্ত ৯৪ জনের মধ্যে সদর উপজেলার ৪২ জন, আলমডাঙ্গার ৯ জন, দামুড়হুদার ৪ জন ও জীবননগর উপজেলার ৩৯ জন রয়েছেন। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের ৩৬.২৯ শতাংশ। এনিয়ে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৯ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলার ১ হাজার ৫৪১ জন, আলমডাঙ্গার ৫৫৫ জন, দামুড়হুদায় ৮০৪ জন ও জীবননগরে ৫৯৮ জন। গতকাল জেলা থেকে আরও ২০ জন সুস্থ হয়েছে। এনিয়ে জেলায় মোট সুস্থ হয়েছে ২ হাজার ৩০১ জন। গতকাল জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে তিনজন ও উপসর্গ নিয়ে তিনজনসহ ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের রেড জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হওয়ে দুজন ও পূর্বে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া একজনসহ করোনা আক্রান্ত হয়ে নতুন তিনজনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জনের। এছাড়াও গতকাল সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও তিনজনের।
গতকাল হাসপাতালের রেড জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হওয়া দুজন হলেন- জ্বিনতলা মল্লীকপাড়ার মৃত কুদরত আলীর ছেলে মোস্তফা খান (৬০) ও সদর উপজেলার আলুকদিয়া ইউনিয়নের দৌলতদিয়ারপাড়ার আহম্মদ আলীর স্ত্রী রোকেয়া আক্তার রিতা (৪৫)। এছাড়া গত মঙ্গলবার সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে মৃত্যু হওয়া আলমডাঙ্গা উপজেলার এক নারীর নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে।
গতকাল সদর হাসপাতালের ইয়োলো জোনে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া তিনজন হলেন- চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বেলগাছি বকচত্বরপাড়ার মৃত বক্স মণ্ডলের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৫০), শান্তিপাড়ার মৃত গফুর সর্দারের ছেলে গোলাম সারোয়ার গুণ্ডু (৬০) ও সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের মৃত তপু মণ্ডলের ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক (৬৫)।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ্ আকরাম জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা আক্রান্ত দুজন ও করোনা উপসর্গ নিয়ে ইয়োলো জোনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। করেনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া প্রত্যেকের শরীর থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। মৃত্যুর পর করোনা প্রটোকলে নিহতের লাশ পরিবারের সদস্যদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও পূর্বে মৃত্যু হওয়া এক নারীর নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জনের।
জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ করোনা পরীক্ষার জন্য গত সোমবার ২৬৮টি, মঙ্গলবার ১৩৫টি ও গত বুধবার আরও ১৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষার জন্য কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে প্রেরণ করে। গতকাল উক্ত নমুনা ও পূর্বের পেন্ডিং নমুনার মধ্যে ২৫৯টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ। গতকাল জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ আরও ২৫৯টি নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করেছে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলা থেকে এ পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ ১৪ হাজার ১৩১টি, প্রাপ্ত ফলাফল ১৩ হাজার ৩১৫টি, পজিটিভ ৩ হাজার ৪৯৯ জন। জেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৮৯ জন হোম আইসোলেশন ও হাসপাতাল আইসোলেশনে রয়েছে। এর মধ্যে হোম আইসোলেশনে আছে ১ হাজার ১৭ জন ও হাসপাতাল আইসোলেশনে ৭২ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার করোনা আক্রান্ত হয়ে জেলায় প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও করোনা উপসর্গে মৃত্যু হওয়া এক নারীর নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ১০৭জন। এর মধ্যে জেলায় আক্রান্ত হয়ে জেলার হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জনের। এরমধ্যে সদর উপজেলার ৩৫ জন, আলমডাঙ্গায় ২১ জন, দামুড়হুদায় ২৭ জন ও জীবননগরে ১১ জনসহ ৯৪জন। এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় আক্রান্ত অন্য ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে জেলার বাইরে।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। গতকাল জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে দুনারীসহ আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে জেলায় আরও ৪৭ জনের নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়ে। গতকাল মেহেরপুর স্বাস্থ্য বিভাগ কুষ্টিয়া পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষিত ১১৫টি নমুনার ফলাফল প্রকাশ করে। এর মধ্যে ৪৭টি নমুনায় করোনা শনাক্ত হয়। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ৪০ দশমিক ৮৬ শতাংশ। নতুন আক্রান্ত ৪৭ জনের মধ্যে মেহেরপুর সদর উপজেলার ৩০ জন, গাংনী উপজেলার ১০ জন ও মুজিবনগর উপজেলার ৭ জন।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিহতরা হলেন- মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার কুঞ্জনগর গ্রামের শরিফ উদ্দীনের স্ত্রী আমিরুন নেসা (৪৫), নতুন মটমুড়া গ্রামের সুবহান আলীর স্ত্রী ফজিলা খাতুন (৫৫), মেহেরপুর সদর উপজেলার কুতুবপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে আনারুল ইসলাম (৫০) ও যাদবপুর গ্রামের মাওলাদ আলীর ছেলে মিয়ারুল ইসলাম (৩৫)। গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্য ফজিলা খাতুন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ও বাকিরা মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে ৪ জন ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনসহ মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত মৃত্যু হয়েছে সদর উপজেলার ৩ জন ও মহেশপুরের ১ জন। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চান্দুয়ালী গ্রামে একজন, কোটচাঁদপুরে দুজন, শৈলকুপার শিক্ষক পাড়ায় একজন এবং মহেশপুরে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে জেলায় নতুন করে ৯৭ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় সদর হাসপাতাল ল্যাব থেকে ২৪৪টি নমুনার ফলাফল হাতে এসেছে। এর মধ্যে ৯৭ জনের দেহে করোনার ধরা পরেছে। আর এসময়ের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, সারা দেশের ন্যায় ঝিনাইদহে শুরু হয়েছে কঠোর লকডাউন। সকাল থেকে ওষুধ, কাঁচাবাজার ছাড়া সকল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। সড়কে জনসাধারণের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। লকডাউনের প্রথম দিনেই সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে অনেকটা জনশূণ্য রাস্তা-ঘাট। আর এ লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য বৃষ্টির মধ্যেও মাঠে আছে প্রশাসন। এছাড়া প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীর ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট।
সারাদেশ:
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ১৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটাই দেশে একদিনে করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে গত ২৭ জুন দেশে সর্বোচ্চ ১১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নতুন ১৪৩ জনসহ দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ১৪ হাজার ৬৪৬ জনে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ হাজার ৩০১ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৯ লাখ ২১ হাজার ৫৫৯ জনে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় ৩২ হাজার ৯২৪ নমুনা সংগ্রহ করা হলেও পরীক্ষা করা হয়েছে ৩২ হাজার ৫৫টি নমুনা। যেখানে শনাক্তের হার ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। এ পর্যন্ত শনাক্তের মোট হার ১৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। একদিনে নতুন করে সুস্থ হয়েছেন ৪ হাজার ৬৬৩ জন। এ নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা ৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৩ জন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারা যাওয়া ১৪৩ জনের মধ্যে ষাটোর্ধ ৭০ জন। এছাড়া ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৪২ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ১৮ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১১ জন, ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একজন এবং ১০ বছরের মধ্যে একজন রয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে পুরুষ ৯০ জন ও মহিলা ৫৩ জন। যাদের মধ্যে বাসায় ১১ জন ছাড়া বাকিরা হাসপাতালে মারা গেছেন। একই সময়ে বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৪৩ জনের মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৪৬ জন, ঢাকায় ৩৫ জন, চট্টগ্রামে ১৫ জন, রাজশাহীতে ১৯ জন, সিলেটে সাতজন, রংপুরে ১০ জন, ময়মনসিংহে তিনজন ও বরিশালে আটজন মারা গেছেন।
কমেন্ট বক্স