মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ছেলেকে সুস্থ করতে দিয়ে লাশ পেল বাবা
- আপলোড তারিখঃ
২৪-০৫-২০২১
ইং
নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে মাহফুজকে, নিরাময় কেন্দ্রের দুই পরিচালকসহ ১৪ জন গ্রেপ্তার
জীবননগর অফিস:
‘ঈদের দিনও ওরা আমার ছেলের সাথে দেখা করতে দিল না, বলল এক মাস পরে দেখা হবে। বুকে পাথর চেপে ঈদ কাটালাম। ভাবলাম মাস পুজতে আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি। তারপর ছেলেকে নিয়ে একসাথে আনন্দ করে খাব। কিন্তু আর খাওয়া হলো না ছেলের সাথে। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে পড়ে রইল হাসপাতালের মর্গে।’ এমন অনেক আহাজারি করে কথাগুলো বলছিলেন মাহফুজ নামের এক কিশোরের মা।
যশোর মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছেলেকে চিকিৎসার জন্য ভর্তির ২৫ দিন পর গত শনিবার মৃত্যু হয়েছে মাহফুজের (১৭)। নিহত মাহফুজ জীবননগর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড নারায়ণপুর গ্রামের মনিরুল ইসলামের ছেলে। গতকাল রোববার বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে যশোর সদর হাসপাতাল থেকে নিহত মাহফুজের লাশ উদ্ধার করেন তার পরিবারের সদস্যরা। তবে পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু না, শারীরিক নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এই নির্যাতনের চিত্র পরিস্কারভাবে ধরা পড়েছে।
সিসি ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে ৮-১০ জন মাহফুজকে ধরে মেঝেতে ফেলে রেখেছেন। এরমধ্যে কয়েকজন পা দিয়ে চেপে রেখেছেন তাকে। অন্যরা দফায় দফায় মাহফুজকে মারপিট করেন। টানা ৬ মিনিটের ভিডিও’র পুরোটা জুড়ে রয়েছে মাহফুজের ওপর নির্মম অত্যাচারের ঘটনা। হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ করে মাহফুজের ডান হাতের কবজির ওপর কামড়ানো দাগ, পিঠের ডান ও বাম পাশে কালচে থেতলানো দাগ, বাম কাঁধের ওপরে থেতলোনো দাগসহ বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন এবং অণ্ডকোষ ফোলা পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় নিহত মাহফুজের পিতা ওই মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকসহ ১৪ জনকে আসামি করে যশোর কোতায়ালী থানায় একটি মামলা করেন। পরে গতকাল রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রের দুই পরিচালকসহ ১৪ জন আসামিকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পরিবারের লোকজনের সাথে অসদাচারণের কারণে ২৫ দিন আগে ছেলের সুচিকিৎসার জন্য যশোর ফুড গোডাউনের পাশে একটি মাদকসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেন তাঁর বাবা। এরপর থেকে ছেলের সাথে কথা বলতে দিতেন না ওই কেন্দ্রের সদস্যরা। গত শনিবার বিকেলে ছেলের বিষয় জানতে চাইলে তারা বলেন, মাহফুজ অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি আছে, সেখানে চলে আসেন। তাদের কথা মতো পরিবারের লোকজন যশোর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখেন মাহফুজের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে সেখানে পড়ে আছে এবং তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্নও রয়েছে।
নিহত মাহফুজের বাবা মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাহফুজ বন্ধুদের সাথে মিশে বিড়ি, সিগারেট খেত, তাকে নিষেধ করলে শুনত না। বরং বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙচুর করত এবং বাড়ির লোকজনের সাথে খারাপ আচরণ করত। এ জন্য পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকে কিছুদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখলে হয়ত সে ভালো হয়ে যাবে। সে মোতাবেক তাকে যশোর ফুড গোডাউনের পাশে ‘মাদক নিরাময় আশ্রয় কেন্দ্র’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। সেখানে আমার ছেলের ওপর অমানসিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। ইতোমধ্যেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আমি যশোর কোতায়ালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।’
জীবননগর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমি যশোরে ওই নিরাময় কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। সেখানে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখেছি, মাহফুজের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে এবং তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।’
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অন্য রোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, ২২ মে শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় ঘুমাতে যায় মাহফুজ। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘরের বাইরে যায় সে। এসময় নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসাধীন কয়েকজন, পরিচালক মাসুদ করিম ও আশরাফুল কবিরের নির্দেশে মাহফুজকে এলোপাতাড়িভাবে মারপিটে গুরুতর জখম করে। এসময় তারা মাহফুজের নাক ও মুখে অতিমাত্রায় পানি ঢালে। নির্যাতনে মাহফুজুর অচেতন হয়ে পড়লে তাকে ভ্যানে করে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে পালিয়ে যায় তারা।
যশোর কোতায়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তাজুল ইসলাম জানান, যশোর মাদক নিরাময় কেন্দ্রে একটি ছেলেকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই কিশোরের পিতা একটি মামলা করেছেন। গতকাল রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রের দুই পরিচালক মাসুদ করিম, আশরাফুল কবিরসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ সোমবার তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, যশোর সদর হাসপাতালে নিহত মাহফুজের ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রোববার বিকেল পাঁচটার দিকে তার মরদেহ জীবননগর পৌর এলাকার নারায়ণপুরে তার নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এসময় স্বজনদের কান্নায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জীবননগর স্টেডিয়াম মাঠে জানাজা শেষে স্টেডিয়াম গোরস্তানে তাঁর দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়।
কমেন্ট বক্স