শিক্ষার্থীদের অনলাইন গেমে আসক্তি এখন চরমে!
- আপলোড তারিখঃ
২৯-০৪-২০২১
ইং
করোনায় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ : পাড়া-মহল্লায় আসর বসিয়ে চলছে ফ্রি ফায়ার-পাবজি খেলা
পরিবার ও অভিভাবকের সচেতনতায় একমাত্র মুক্তির পথ : অধ্যক্ষ ড. সাইফুর রশিদ
রুদ্র রাসেল:
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ছেড়ে আধুনিক স্মার্টফোনে ফ্রি ফায়ার ও পাবজি গেমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এ খেলায় আসক্ত হচ্ছেন। অভিভাবকরা বাঁধা দিলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না। আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফ্রি ফায়ার গেম খেলাকে কেন্দ্র করে গত ১৮ এপ্রিল অন্তর হোসেন নামের এক কিশোরের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এমন অবস্থায় সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অভিভাবকেরা। এদিকে, অভিভাবকসহ পরিবারের সদস্যদের সচেতনতায় পারে কিশোরদের মোবাইল গেমিং আসক্তি থেকে মুক্তি দিতে, বলছেন সচেতন মহল।
চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন এলাকার মোড়ে, দোকানের সামনে, খেলার মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে যে, খুব দ্রুত ইন্টারনেট ফাইটিং গেম ফ্রি ফায়ার এবং পাবজি গেমসে মারাত্মকভাবে ঝুঁকছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা। করোনা মহামারি সময় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অবসর সময়ে এ গেমসে জড়িয়ে পড়ছে তারা। পাড়া-মহল্লায় প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীদের মোবাইল নিয়ে ফ্রি ফায়ার, পাবজি গেম খেলার আসর। গেম খেলার সময় অবিরত তাঁদের মুখ থেকে শুনা যাচ্ছে বোম মার! বোম মার! গুলি কর! লুকা, পালা, রিভাইব দে, হিল কর, স্মোক মার! এছাড়াও নানা ধরণের নতুন নতুন শব্দ। দিনের বেশিরভাগ সময় পাড়ার মোড়ে, খোলা মাঠে, বাগানের মধ্যে টুল, পাটি পেতে আসর জমিয়ে উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীদের আড্ডা ও অনলাইন গেম খেলার এ দৃশ্য এখন চোখে পড়ার মতো।
‘সারা দিন মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র রাফাত (ছদ্মনাম)। মা-বাবার সঙ্গে কোথাও যেতে চাই না। এলাকার সমবয়সীদের ছেলেদের সঙ্গে বেশিরভাগ সময় গোল হয়ে বসে মোবাইলে গেম খেলে। গল্পের বই পড়ে না। ক্রিকেট বা অন্য কোনো খেলাও খেলে না। মোবাইরে ফ্রি ফায়ার গেম ছাড়া আর কোনো কিছুতে আগ্রহ নেই তার। বাসার ওয়াই-ফাই কয়েক মুহূর্তের জন্য বন্ধ থাকলে তার উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। অস্থিরতা শুরু করে। মা-বাবা রাগ করে তার মুঠোফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই শান্ত সুবোধ রাফাত অগ্নিমূর্তি হয়ে বাসার দরজা আটকে দেয়, মা-বাবাকে কটূবাক্য বলে, চিৎকার করে আবার তার মুঠোফোনটি নিজের কাছে নিয়ে আসে।’
মায়ের কাছে আবদার করায় ১২তম জন্মদিনে ছেলেকে শখ করে মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছিলেন রাফাতের বাবা। মোবাইল পেয়ে আনন্দে ফেটে পড়ে মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরা রাফাতের সম্পর্ক এখন আর ভালো যাচ্ছে না তাঁদের সঙ্গে। সারা দিনই মোবাইলে গেম খেলে রাফাত। নিষেধ করলেও শোনে না, মোবাইল কেড়ে নিলে তা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত না খেয়ে বসে থাকে সে। রাতে বাড়িতে পড়াতে আসা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে একঘণ্টা লেখাপড়া করলেও এর বেশি সময় আর পড়তে বসে না। এ অবস্থায় সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন রাফাতের পিতা-মাতা।’ বলছিলাম চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের মোবাইল গেমে আসক্ত স্কুলপড়ুয়া রাফাত ও গেমে আসক্তি নিয়ে তাঁর পিতা-মাতার উদ্বেগের কথা। রাফাতের পিতা-মাতার সঙ্গে এক দীর্ঘ আলাপে তাঁরা এ সকল তথ্য জানান।
মোবাইল বা ভিডিও গেমে আসক্তিকে মনঃস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মাদকাসক্তির মতো ইন্টারনেটে মাত্রাতিরিক্ত থাকা বা গেম খেলাও আসক্তি। এটা আচরণগত আসক্তি। কেবল সচেতনতায় পারে এই আসক্তি থেকে মুক্ত করতে।
রাফাতের মতো এমন বৈশিষ্ট্যের কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে মা-বাবারা সংকটে থাকেন। চুয়াডাঙ্গা জেলা বা বাংলাদেশেই শুধু নয়, সারা পৃথিবীতেই এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনোস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন জরিপ আর গবেষণার পর ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজ ১১তম সংশোধিত সংস্করণে (আইসিডি-১১), ‘গেমিং অ্যাডিকশন’ হিসেবে একে মনোস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছে ২০১৮ সালের জুন মাসে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে প্রকাশিতব্য আইসিডি-১১ শীর্ষক রোগ নির্ণয়ে গাইডবুকে এটি সংযুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অনলাইন গেম, মুঠোফোন, কম্পিউটার বা ভিডিও গেমের ক্ষতিকর ব্যবহারকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত মানসিক রোগ নির্ণয়বিষয়ক গাইডলাইনে (ডিএসএম-৫-) বিষয়টিকে ‘ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করে গবেষণার ভিত্তিতে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করেছিল।
যদিও গেম আসক্তি বিষয়টি ইন্টারনেট আসক্তি থেকে খানিকটা আলাদা। কখনো দেখা যায় ইন্টারনেটে কেউ অতিরিক্ত পরিমাণে গেম খেলছে, কেউ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত, কেউবা নানা সফটওয়্যার বা এসব নিয়ে মশগুল আর কেউবা ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করছে দিনের বেশির ভাগ সময়। মোটাদাগে সবই হচ্ছে ননকেমিক্যাল অ্যাডিকশন বা আচরণজনিত আসক্তি। বিশ্বজুড়ে এই বিষয়ে প্রকাশিত ১৬টি গবেষণাপত্রের ডেটা অ্যানালাইসিস করে দেখা গেছে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ইন্টারনেট গেমিংয়ে আসক্তিতে ভুগছে। যাদের মধ্যে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হচ্ছে কিশোর আর ১ দশমিক ৩ শতাংশ কিশোরী (জে ওয়াই ফ্যাম, ২০১৮)।
বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসির তথ্যমতে, এপ্রিল ২০১৯-এ বাংলাদেশে প্রায় ৯ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ ইন্টারনেটের গ্রাহক, আর এদের মধ্যে ৮ কোটি ৭৯ লাখ ব্যবহারকারী মুঠোফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়। ২০১৬ সালের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৩৫ শতাংশ হচ্ছে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরী। এরাই কিন্তু গেমিং আসক্তি হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ফ্রি ফায়ার, পাবজিসহ এই ধরনের ইন্টারনেট গেমে কিশোররা এতোটায় আসক্ত হয়ে পড়েছে যে, ফ্রি ফায়ার গেম খেলাকে কেন্দ্র করে গত ১৮ এপ্রিল আত্মহত্যা করে অন্তর হোসেন নামের কিশোর। ওইদিন রাত তিনটার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কিশোর অন্তর হোসেনের মৃত্যু হয়। ফ্রি ফায়ার গেম খেলা নিয়ে বকাবকি করলে পিতার ওপর অভিমান করে বিষপান করে আত্মহত্যা করে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের কুন্দিপুর গ্রামের পালপাড়ার আইয়ুব আলীর ছেলে ও কুন্দিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র অন্তর।
আত্মহত্যাকারী অন্তরের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যায় ইফতার শেষে অন্তর নামাজ পড়ে এসে মোবাইল নিয়ে ফ্রি ফায়ার গেম খেলতে শুরু করে। এসময় পিতা আইয়ুব আলী অন্তরকে খাবার খেয়ে নিতে বলে। অন্তর খাবার না খেয়ে গেম খেলতেই থাকে। কিছুক্ষণ পরে আইয়ুব আলী গেম খেলার জন্য অন্তরকে বকা-ঝকা করে। এসময় অন্তর অভিমান করে বাড়ির বাইরে চলে যায়। রাত ১১টার দিকে সে বাড়িতে ফিরলে পরিবারের সদস্যরা তাঁর বিষপানের বিষয়টি বুঝতে পেরে স্থানীয় একটি চিকিৎসকের কাছে নেয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদান করেন। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাত ২টার দিকে অন্তরকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৩ টার দিকে সে মারা যায়।
সারোয়ার আমান (ছদ্মনাম) নামের দশম শ্রেণির এক স্কুলপড়ুয়া বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ার মোড়ে বসে মোবাইলে গেম খেলছিল। কী গেম আর গেমটি খেলতে কেমন জানতে চাইলে সে বলে, ‘ফ্রি ফায়ার গেম খেলছি। এই গেমস সম্পর্কে আগে কিছু জানতাম না। প্রথমে অনেক মজা লাগতো, মনে হতো গেম নয় নিজেই যেন বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখন ফ্রি ফায়ার গেম খেলাটা নেশা হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে নেট সমস্যায় এ গেমস খেলতে ঝামেলা হলে মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলার ইচ্ছা হয়। এই গেম যে একবার খেলবে সে আর ছাড়তে পারবে না।’
গেম খেলায় ইন্টারনেট খরচ বা গেম খেলতে আর কোনো খরচ হয় কিনা জানতে চাইলে সারোয়ার আমান আরও বলে, ‘প্রথমে কোনো খরচই ছিলো না, বন্ধুর বাড়ির ফ্রি ওয়াই-ফাই দিয়ে খেলতাম। কিন্তু সারাদিন তো বন্ধুর বাড়িতে থাকা যায় না। তাই নিজেই মেগাবাইট কিনা শুরু করলাম। প্রথমে মাসে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মেগাবাইট খরচ হতো। মেগাবাইট ছাড়া অন্য কোনো খরচ ছিল না। ধীরে ধীরে যখন এটা ভালো লাগে তখন প্রতিটা ইভেন্টে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ না করলে যেন হয়ই না। গেমটিতে পুরোপুুরিভাবে মনোযোগ দিয়ে যখন খেলি তখন দেখি গেমের ভেতরে এমন কিছু জিনিস আছে যেগুলো না কিনলেই নয়। যেমন অলকের দাম ৪০০ টাকা, একটা জার্সি ৩০০ টাকা, নতুন ইভেন্টে আসলেই আরও খরচ।’
চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের মণ্টু আলি নামের এক দিনমজুর বলেন, ‘আমার দুই ছেলে একজন অষ্টম ও অপরজন পঞ্চম শ্রেণিতে। করোনা শুরু হওয়ার পর ওদের স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতেই থাকতো। সারাদিন সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলা করতো। একদিন বড় ছেলে মোবাইল কিনে দিতে বলে, গেম খেলবে। ওই সপ্তাহেই সদর হাসপাতাল এলাকার দুইটি ফার্মেসি দোকানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। সন্ধ্যার পর বাড়িতে লেখাপড়া করে। সকালে উঠে খাওয়া দাওয়া করে আবার ফার্মেসিতে চলে যায়। যতদিন স্কুল শুরু না হয় ততদিন কাজ শিখুক। ওরা মোবাইল গেমে আসক্ত হোক বা বাজে ছেলেদের সঙ্গে মিশে বিড়ি-সিগারেট খেয়ে খারাপ হয়ে যাক তা আমি চাই না, ওরাই আমার একমাত্র সম্বল।’
চুয়াডাঙ্গা রেল স্টেশন এলাকার এক চায়ের দোকানে চা খেতে আসা ‘মকবুল মণ্ডল (৬৫) নামের এক বৃদ্ধ মোবাইল গেম নিয়ে তার উদ্বেগের কথা বলছিলেন। এসময় তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘মার! মার! গুলি কর! গুলি কর! গ্রেনেড মার! এসব কথা শুনে হঠাৎ রাতে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠি। রাত আনুমানিক ১২টা। উঠেই শুনি গুলাগুলির শব্দ আর আমার নাতির চিল্লানোর শব্দ আসছে পাশের রুম থেকে। যেয়ে দেখি নাতির হাতে মোবাইল। কী হয়েছে কে গুলি করবে, কাকে গুলি করবে জিজ্ঞাসা করলে নাতি হাসতে হাসতে বলে, দাদু তুমি বুঝবা না, মোবাইলে গেম খেলছি। ওর মা-বাবাও এই গেম খেলা নিয়ে ওকে বকে, কিন্তু কারও কথা সে শোনে না।’
এবিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এএসএম ফাতেহ্ আকরাম বলেন, ‘ইন্টারনেট বা গেম খেলা কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়। কিন্তু এর ক্ষতিকর, অযৌক্তিক, অপরিমিত ব্যবহার চিন্তা আর আচরণের ওপর প্রভাব ফেলে। এই ইন্টারনেটের ব্যবহার বা গেম খেলার বিষয়টি যখন তার চিন্তা আর আচরণের ওপর খারাপ ধরণের প্রভাব ফেলবে, সামাজিক দক্ষতা কমিয়ে দেবে বা দৈনন্দিন জীবনযাপনের মান খারাপ করে দেবে, তখন তা আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। বিভিন্ন সময় দেখা যায় সন্তানকে শান্ত রাখতে মুঠোফোনসহ নানা যন্ত্রপাতি তাদের হাতে তুলে দেন ব্যস্ত মা-বাবারা। তাঁরা নিজেরাও মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকেন। অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে সন্তানকে সবসময় নিজের চোখের সামনে দেখতে চান মা-বাবা। সে ক্ষেত্রে তাদের হাতে মুঠোফোন-ল্যাপটপ তুলে দিয়ে আপাতত স্বস্তি অনুভব করেন, যা শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেটে আসক্ত করে ফেলে। পরিবারের সদস্যদের অসতর্কতায় কিশোর-কিশোরীদের মোবাইল গেম বা ইন্টারনেটে আসক্তির প্রধান কারণ। যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, তাই কোন সন্তান এ ধরণের আসক্তি পড়লো তা নির্ণয় করে পরিবারের সদস্যদের উচিৎ তাঁদেরকে পারিবারিক কাজে ব্যস্ত রাখা। সন্তানরা বাড়িতে বাবা-মায়ের কাজে সাহায্য করলে তবেই তো বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক ভলো থাকবে। মোবাইল হাতে দিয়ে গেম খেলতে নিষেধ করলে সন্তানরা বাবা-মায়ের কথা শুনবে না, রাগা-রাগী করবে। সন্তানদেরকে নৈতিকতা শেখাতে হবে, স্কাউটিং করাতে হবে, মানুষকে সাহায্য করা শেখাতে হবে। কোন সন্তান মোবাইল গেমে আসক্ত হয়ে পড়লে বাবা-মায়ের উচিৎ হবে তাদেরকে গেম খেলতে নিষেধ না করে, গেম থেকে সরাতে বিভিন্ন ছোট ছোট কাজ দিয়ে সেগুলো সম্পূর্ণ করার অনুপ্রেরণা দেওয়া। কিশোরদের মধ্যে কোন কাজ হাতে নিলে তা সম্পন্ন করার মতো মানসিক শক্তি থাকে। এর ফলে তারা বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারবে একই সঙ্গে মোবাইল গেম বা ইন্টারনেট আসক্তি থেকে মুক্তি পাবে।’
এবিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. এ কে এম সাইফুর রশিদ বলেন, ‘বর্তমানে মোবাইল গেম শিক্ষার্থীদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তাঁদের অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং মোবাইল তাঁদেরকে দিতেই হবে। মোবাইল নিয়ে হয়তো তাঁরা ২ ঘণ্টা ক্লাস করছে, তারপর গেম খেলছে। রাত জেগে গেম খেলছে বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছে। পরে আবার বাইরে যেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গেম-আসরে মেতে উঠছে। অভিভাবকরা গেম খেলতে নিষেধ করলে সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসি থেকে এই ধরণের গেম খেলার সময়ের ওপর বিধি-নিষেধ নিয়ে আসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রয়োজন পিতা-মাতার সতর্কতা। এই ধরণের মহামারি সময়ে অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে, তাঁদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। অভিভাবকসহ পরিবারের সদস্যদের সচেতনতায় পারে কিশোরদের মোবাইল গেমিং আসক্তি থেকে মুক্তি দিতে।’
কমেন্ট বক্স