ফের লকডাউনে দেশ
- আপলোড তারিখঃ
০৪-০৪-২০২১
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ ভয়াবহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ৩৭৩ দিন পর আবারও সারা দেশে আগামীকাল থেকে এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। তবে লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পণ্যবাহী পরিবহনের পাশাপাশি খোলা থাকবে সংবাদপত্র সংশ্লিষ্ট পরিবহনও। এর বাইরে শুধু শিল্পকারখানা খোলা থাকবে। শ্রমিকরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিফট অনুযায়ী কাজ করবেন। সবাইকে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় লকডাউন আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। লকডাউনের সময় বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ বন্ধ থাকবে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল। তবে উড়োজাহাজের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকছে। এদিকে, লকডাউন ঘোষণার পরেই ফাঁকা হতে শুরু করেছে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছে। তাই গতকাল বাস, ট্রেন, লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় বিকেল থেকে ছিল উপচে পড়া ভিড়।
লকডাউনের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল বিকালে ভার্চুয়াল মিটিং করেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। এ সময় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিব, আইজিপি, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সব ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। দীর্ঘক্ষণ চলা এই বৈঠক বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে নেওয়া সুপারিশগুলো প্রস্তাবনা আকারে রাতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি অনুমোদন দিলে যে কোনো সময় জারি করা হবে লকডাউন কার্যকরের প্রজ্ঞাপন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামীকাল থেকে লকডাউন চলাকালে সারা দেশে পণ্যবাহী যানবাহন, পণ্যবাহী ট্রেন, শিল্পের কাঁচামাল, সংবাদপত্রের গাড়ি, দূতাবাসের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন ছাড়া যাত্রীবাহী কোনো বাস, ট্রেন বা লঞ্চ চলবে না। খাবার হোটেলে খাবার পরিবেশন করা যাবে না। তবে বাসাবাড়িতে পার্সেল পাঠানো যাবে। খোলা থাকবে কাঁচাবাজার। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেগা প্রকল্পের কাজ যথারীতি চলবে। গার্মেন্ট শিল্প কলকারখানা চালু থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন-জীবিকা সচল রেখেই করোনা সংক্রমণ রোধে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এদিকে লকডাউনে শপিং মল, মার্কেট, দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে দৈনিক চার ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।
সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারা বলেন, সামনে রমজান ও ঈদ। আমরা দিনমজুর। দিন আনি, দিন খাই। কিছু টাকা উপার্জন করে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে ঈদ করব, ভেবেছিলাম। এখন কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। কীভাবে সংসার চালাব? সরকার লকডাউন না দিয়ে বিকল্প উপায়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারত। তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সুবিধা হতো। এখন লকডাউন দিলে কীভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাঁচব?
লকডাউনের বিষয়ে রিকশাচালক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘লকডাউন দিলে তো আমাদের কিছুই করার থাকবে না। তবে সরকারের উচিত আমাদের মতো দিনমজুরের কথা চিন্তা করে অন্যভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। সবার ভালোর জন্য যদি লকডাউন দেওয়া হয় রোজার আগে তা শেষ করা উচিত। তা না হলে বাড়িতে ছেলে-মেয়ে না খেয়ে থাকবে।’ ‘সরকারের উচিত ছিল ১৫ দিন আগেই লকডাউন দেওয়া। করোনার পরিস্থিতি তো এখন বাড়েনি, অনেক আগেই এটা বাড়তির দিকে। তখন দিলে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে থাকত। সামনে রমজান ও ঈদ। করোনার পরিস্থিতি থেকেও ভয়াবহ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে না খেয়ে থাকা’ মন্তব্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিমুল রহমানের।
লকডাউনে কী খোলা ও বন্ধ থাকছে
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গতকাল শনিবার দুপুরে গণমাধ্যমকে বলেন, জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান, কাঁচাবাজার, ওষুধ ও খাবারের দোকানের পাশাপাশি পোশাক এবং অন্যান্য শিল্পকারখানা লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, আমরা চাচ্ছি লকডাউনে মানুষের চলাচল যতটা সম্ভব বন্ধ করার। কারণ, যেভাবে করোনা ছড়াচ্ছে তাতে মানুষের ঘরে থাকা জরুরি। তবে জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান, কাঁচাবাজার, খাবার ও ওষুধের দোকান লকডাউনের আওতামুক্ত থাকবে। এছাড়া পোশাক ও শিল্পকারখানাগুলো খোলা থাকবে। কারণ, কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের বাড়িতে ফেরার তাড়া থাকে। এতে করোনার ঝুঁকি আরও বাড়ে। কারখানায় শ্রমিকদের একাধিক শিফটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করতে বলা হবে।
বন্ধ থাকছে অভ্যন্তরীণ রুটের সব ফ্লাইট
লকডাউন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ সব রুটের ফ্লাইট বন্ধ থাকছে। গতকাল শনিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সোহেল। তিনি বলেন, ‘লকডাউনের সময় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ থাকবে মর্মে সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি লকডাউন চলাকালীন অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকবে। সরকার যেদিন থেকে লকডাউন কার্যকর করবে সেদিন থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলও বন্ধ
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতি হওয়ায় আগামী সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য সারা দেশে লকডাউন দিচ্ছে সরকার। লকডাউনে মালবাহী ছাড়া যাত্রীবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। গতকাল শনিবার বিআইডব্লিউটিএ'র চেয়ারম্যান কমোডোর গোলাম সাদেক বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে সোমবার সকাল ৬টা থেকে সারা দেশের সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান বন্ধ থাকবে। তবে মালবাহী জাহাজ চলাচল করবে।
লকডাউনে বন্ধ থাকছে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল
লকডাউনে জরুরি খাদ্য ও পণ্যবাহী ট্রেন ছাড়া সব যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে শিগগিরই। বিষয়টি জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। তিনি বলেন, লকডাউন শুরু হবে আগামীকাল সোমবার থেকে। লকডাউনে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি খাদ্য ও পণ্য পরিবহন করা হবে।
বন্ধ থাকবে দোকানপাট-শপিংমল
লকডাউনের সময় সব দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ থাকছে। দোকান মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, লকডাউনের বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমাদের মানতেই হবে। কারণ দেশের করোনা পরিস্থিতি এখন ভালো না। তাই আগামী ৫ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ থাকবে। তবে আমাদের দাবি এই লকডাউন এক সপ্তাহের বেশি যেন না বাড়ে। তিনি আরও বলেন, এর আগে সরকারের নির্দেশনা অনুসারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা শপিংমল ও দোকানের ব্যবসা পরিচালনা করেছি। নতুন করে যদি এর সঙ্গে কিছু যোগ করে তাও আমরা মানতে রাজি। তবে ঘোষিত লকডাউনের সময় যেন আর না বাড়ে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্টদের জানাচ্ছি। কারণ এক সপ্তাহ পর সময় বাড়ালে অনেক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। এ বিষয়ে বসুন্ধরা সিটি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (অ্যাকাউন্ট) শেখ আব্দুল আলিম বলেন, লকডাউনের ঘোষণা এসেছে, তবে এখন পর্যন্ত পুরো নির্দেশনা পাইনি। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে সেভাবেই আমরা চলব। শপিংমল এক সপ্তাহ বন্ধ রাখতে বললে আমরা বন্ধ রাখব।
কমেন্ট বক্স