অর্থের নতুন উৎস সন্ধানে সরকার
- আপলোড তারিখঃ
২১-০৩-২০২১
ইং
স্বশাসিত সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ সংগ্রহ ও বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে
সমীকরণ প্রতিবেদন:
কাক্সিক্ষত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়ার কারণে অর্থের নতুন উৎসের সন্ধানে নেমেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে দু’টি নতুন উৎসের হদিসও পাওয়া গেছে। এর একটি হচ্ছে, স্বশাসিত সংস্থাগুলোয় থাকা উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আরো বেশি করে নিয়ে আসা। চলতি অর্থবছরে এসব সংস্থা থেকেই ১৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে আসার টার্গেট করা হয়েছে। অপর উৎস হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে তা বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা। ইতোমধ্যে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে ঋণ নেয়া শুরু করে দেয়া হয়েছে। অর্থ সংগ্রহের এই দুই উৎসের সন্ধান দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘দ্রুত দারিদ্র্যবিমোচন এবং কোভিড-১৯ জনিত অভিঘাত মোকাবেলা করে উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক বিনিয়োগ। আমাদের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনো কম রয়েছে, তাই বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের নতুন উৎস অনুসদ্ধান জরুরি হয়ে পড়েছে।’
অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে অর্থায়নের বিকল্প দুই উৎসের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে প্রথম উৎস হিসেবে বলা হয়েছে, ‘স্বশাসিত সংস্থাসমূহের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি তহবিলে জমা প্রদান আইন, ২০২০। এই আইনের আওতায় গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৬ হাজার ৪৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে আরো ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সংগৃহীত হতে পারে।’ অর্থের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী রিজার্ভের অর্থ উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহার করা। এ সম্পর্কিত বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা একটি নীতিমালা প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, বিকল্প উৎস থেকে ইতোমধ্যে পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে পাঁচ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। অনেক বছর ধরে তা ১১ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। কারণ কোনো বছরই বাজেটে যে টার্গেট দেয়া হয় সে অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয় না। চলতি বছরেও তা সম্ভব হবে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এ বছরের রাজস্ব আদায় ঘাটতি লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে যাবে। রাজস্বের এই ঘাটতি মাথায় রেখেই আমাদের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোতে দেশী-বিদেশী অর্থায়ন প্রয়োজন। বিদেশ থেকে আগের মতো আর সহজ শর্তে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে এখন আমাদের দেশীয় উৎস থেকে বিকল্প অর্থের অনুসদ্ধান করতে হচ্ছে। আপাতত দুই উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে। এর পর আরো নতুন উৎস খুঁজে দেখা হবে। ইতোমধ্যে রিজার্ভের অর্থ উন্নয়নকার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই তহবিলের নামকরণ করা হয়েছে-বাংলাদেশ উন্নয়ন তহবিল (বিআইডিএফ)। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে রিজার্ভের অর্থ দিয়ে এ ধরনের তহবিল গঠন এটাই প্রথম। এই তহবিলের অর্থ থেকে বন্দর ও বিদ্যুৎ খাতে অর্থায়ন করা হবে। বছরের সর্বোচ্চ দুই বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করা যাবে। এ দিকে মোট ৬৮টি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকার অর্থ সংগ্রহ করছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত জমা আছে ২৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কাছে জমা আছে ২১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। পেট্রোবাংলার কাছে ১৮ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে আছে ১৩ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জমা টাকার পরিমাণ ৯ হাজার ৯১৩ কোটি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জমা টাকা আছে ৪ হাজার ৩০ কোটি। এর মধ্যে এই সংস্থাগুলোর কাছ থেকে গত বছর আদায় করা সম্ভব হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের এক সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে এই সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়েছে। আশা করছি চলতি অর্থবছরে জমার পরিমাণ একই রকম হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি সংস্থা থেকে আমরা পাঁচ হাজার কোটি টাকা পেয়েছি। এর আগে গত বছর সরকারের পক্ষ থেকে একটি আইন পাস করা হয়েছে। ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা আইন, ২০২০’ এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সময়াবদ্ধ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং তাহাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে একটি উন্নত দেশ গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর তহবিলে জমাকৃত উদ্বৃত্ত অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের নিমিত্ত বিধান প্রণয়নকল্পে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।’
আইনে বলা হয়েছে, ‘উদ্বৃত্ত অর্থ’-এর অর্থ তফসিলভুক্ত কোনো সংস্থার বার্ষিক পরিচালনা ব্যয়, নিজস্ব অর্থায়নে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক ব্যয় এবং বার্ষিক পরিচালনা ব্যয়ের ২৫ শতাংশের অতিরিক্ত অর্থ। আইন অনুযায়ী, তফসিলভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো আপৎকালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ যা তাদের বার্ষিক পরিচালন ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের সম-পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত হিসেবে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে পারবে। প্রণীত আইনে ৬১টি সংস্থাকে তফসিলভুক্ত করা হয়েছে।
এগুলো হচ্ছেÑ জাতীয় কারিকুলাম এবং টেক্সটবুক বোর্ড; বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড; বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, কুমিল্লা; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল; উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, দিনাজপুর; জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়, গাজীপুর; বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়; বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি; পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বগুড়া; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ; বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল; জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন; বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন; পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড; রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ; চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ; খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ; রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ; বাংলাদেশ সেরিকালচার বোর্ড; রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো; বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ; বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ; বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন; বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান; বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান; বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান; বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন; পেট্রোবাংলা; বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন; ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ; বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন; বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন; বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন; বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন; বাংলাদেশ চা বোর্ড; বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন; বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন; বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ; চট্টগ্রাম ওয়াসা; ঢাকা ওয়াসা; বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড; পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড; চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ; মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ; বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ; বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন; বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড; বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন।
কমেন্ট বক্স