মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

উত্তপ্ত আদালত প্রাঙ্গণ; সকল কার্যক্রম বন্ধ, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন

  • আপলোড তারিখঃ ১৯-০৩-২০২১ ইং
উত্তপ্ত আদালত প্রাঙ্গণ; সকল কার্যক্রম বন্ধ, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
চুয়াডাঙ্গায় আইনজীবী ও জজশিপ কর্মচারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজের প্রত্যাহার দাবিতে আইনজীবীদের অনির্দিষ্টকালের আদালত বর্জন নিজস্ব প্রতিবেদক: চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতে আইনজীবী ও জজশিপের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ তুলেছে দুই পক্ষ। হামলার অভিযোগ এনে ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বজলুর রহমানের প্রত্যাহারের দাবিতে আদালত বর্জন করেছেন আইনজীবীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালত ভবনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর থেমে গেছে আদালতের সকল কার্যক্রম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে আদালতের এক কর্মচারীর বদলির বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ) বজলুর রহমানের অফিসে যান আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ। এসময় আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারকের মতপার্থক্য তৈরি হলে সেখানে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় আদালতের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচীরারা বিচারকের কার্যালয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর এক শিক্ষনবিশ আইনজীবী আটকের খবরে আবারও উত্তপ্ত হয় আদালত প্রাঙ্গণ। এসময় পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করে। আইনজীবীদের ভাষ্য, সদ্য বিদায়ী জেলা ও দায়রা জজ রেজা মো. আলমগীর হাসান ১৫ মার্চ চাকরি থেকে অবসর নেন। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-১ আদালতের বিচারক মো. বজলুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পান। শেষ কর্ম দিবসে তিনি জেলা জজ আদালতের নাজির মো. মাসুদুজ্জামানকে অনুলিপি শাখার প্রধান তুলনা সহকারী পদে বদলি এবং প্রেষণে রেকর্ডকিপার হিসেবে দায়িত্ব দেন। সেই সঙ্গে জেলা জজ আদালতের পেশকার (বেঞ্চ সহকারী) নুরুল হককে নাজির পদে মো. মাসুদুজ্জামানের স্থলে নিয়োগ দেন। কিন্তু মো. মাসুদুজ্জামান গত চার দিনেও নুরুল হককে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট আদালতে অচলাবস্থা দেখা দেয়। বিষয়টি সুরাহা করতে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক তালিম হোসেনসহ কার্যকরী পরিষদের সদস্যরা ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজের খাসকামরায় যান। বিচারকের সামনেই মাসুদুজ্জামান, জহুরুল ইসলামসহ আদালতের কর্মচারীরা আইনজীবীদের লাঞ্ছিত করেন। ``এ ঘটনার পর জেলা আইনজীবী সমিতির এক জরুরি সভায় ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহা. বজলুর রহমানের প্রত্যাহার দাবি করে আদালত বর্জনের ঘোষণা দেন তাঁরা। চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. আলমগীর হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক তালিম হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জেলা আইনজীবী সমিতির ওই জরুরি সভায় পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সিনিয়র আইনজীবী অ্যাড. আকসিজুল ইসলাম রতন বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করে বক্তব্য দেন। অ্যাড. আকসিজুল ইসলাম রতন বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত দুর্নীতিগ্রস্ত জেলা ও দায়রা জজ (অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-১) মোহা. বজলুর রহমানের খাসকামরায় আলোচনা চলাকালে জেলা ও দায়রা জজ-১, এর খাস কামরার সামনে তিনি অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ তিনি শুনতে পান, মাসুদ ও জহুরুল অন্যান্য স্টাফদের বলছে, জেলা ও দায়রা জজ-১ আদালতের খাসকামরায় প্রবেশ করে জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির ওপর আক্রমণ করার জন্য। তিনিসহ অ্যাড. মোখলেছুর রহমান, অ্যাড. ফজলে রাব্বী সাগর, অ্যাড. তসলিম উদ্দিন ফিরোজ দেখেন যে, দুর্নীতিপরায়ন স্টাফরা খাসকামরায় প্রবেশ করে আইনজীবী সমিতির সভাপতিসহ অনান্যদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে এবং স্টাফ জহুরুল হকিস্টিক নিয়ে আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে আঘাত করলে, আইনজীবী সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আসলাম উদ্দিন (২) আঘাতটি ঠেকাতে গেলে তার ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে লেগে কেটে গুরুতর জখম হয়। স্টাফ মাসুদ ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে সভাপতিকে আঘাত করলে সভাপতি মাথা সরিয়ে নেওয়ায় আঘাতটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-১ম আদালতের খাসকামরার টেবিলের কাচে লেগে কাচ ভেঙে যায়। এসময় অনান্য আইনজীবীরা উপস্থিত হয়ে কার্যনির্বাহী সদস্যগণকে নিরাপদে খাসকামরা থেকে বের করে নিয়ে আসে। আসার পথে স্টাফরা সংঘবদ্ধ হয়ে কার্যনির্বাহী সদস্যসহ আইনজীবীদের বিভিন্ন হুমকি দেয়। পরে গুরুতর জখম আইনজীবীকে চিকিৎসার জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।’ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুর্নীতিগ্রস্থ স্টাফরা ওই হামলার মাধ্যমে ফৌজদারী অপরাধ করেছে। তারা আদালতের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। তারা জনমনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জরুরি সভায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সিন্ধান্ত গৃহীতসহ আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে- হামলাকারী ও দুর্নীতিবাজ স্টাফদের বিরুদ্ধে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। চুয়াডাঙ্গা জেলা জজশিপের দুর্নীতিপরায়ণ বর্তমান ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ (অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-১ম) মোহা. বজলুর রহমান ও দুনীতিপরায়ন অফিস স্টাফ মাসুদুর রহমান (দুর্নীতির কারণে নাজির পদ হতে পদবনিত হয়ে বর্তমান প্রধান অনুলিপি কারক) ও স্টাফ জহুরুল ইসলাম (সেরেস্তা সহকারী) চুয়াডাঙ্গা জেলা জজশিপ থেকে বদলি না করা পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতি অনির্দিষ্টকাল কলমবিরতি করে সকল বিচারিক কার্যক্রমে অংশ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখবে। বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলা ও হামলার প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে জেলা আইনজীবী সমিতি কর্তৃক আগামী রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় মানবন্ধন করা হবে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এ জরুরি সভায় বক্তব্য দেন সিনিয়র আইনজীবী মোসলেম উদ্দিন, এস এম রফিউর রহমান, সেলিম উদ্দিন খান, মুন্সী শাহজাহান মুকুল, নুরুল ইসলাম, মারুফ সরোয়ার বাবু, আকসিজুল ইসলাম রতন, ফজলে রাব্বী সাগর, খন্দকার অহিদুল ইসলাম (মানি খন্দকার), মোখলেছুর রহমান, তসলিম উদ্দিন ফিরোজ প্রমুখ। এদিকে, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির ও চুয়াডাঙ্গা বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি সাংবাদিকদের জানান, ‘সদ্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজা মো. আলমগীর হাসান গত ১৩/১২/২০২০ তারিখ অত্র জজশিপে যোগদান করে চাকরিরত থাকাবস্থায় ১৫/৩/২০২১ তারিখ অবসর পরবর্তী ছুটিতে যান। তিনি শেষ কার্যদিবসে অর্থাৎ ১৫/৩/২০২১ তারিখ বিকেল ৫টায় বিধি মোতাবেক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১ম মোহা. বজলুর রহমানের কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন। চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতের বর্তমান নাজির মাসুদুজ্জামানকে গত ৯/৮/২০২০ তারিখে ভারপ্রাপ্ত নাজির হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে নিয়োগ ও বাছাই সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিধি মোতাবেক গত ২০/১/২০২১ তারিখে তাকে জেলা জজ আদালতের নাজির হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। গত ১৫/৩/২০২১ তারিখ বিকেল ৫টায় দায়িত্ব হস্তান্তর করার পর ঐদিন রাত ১২টায় বারের সভাপতি অ্যাড. আলমগীর হোসেন এবং বর্তমান পেশকার নুরুল হক, আপিল সহকারী শাখাওয়াত হোসেন ও গানম্যানসহ জেলা জজের বাসভবনে যান। সেখানে বসে রাত সাড়ে ১২টায় বর্তমান নাজিরকে নাজির পদ হতে প্রত্যাবর্তন করে বেঞ্চ সহকারী নুরুল হককে নাজির পদে পদায়নের একটি আদেশ স্বাক্ষর করা হয়। পরের দিন ১৬/৩/২০২১ তারিখে সদ্য ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহা. বজলুর রহমানের কাছে আসলে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে আদেশ ও ইস্যু বই নিয়ে আসার জন্য বলেন। বিকেল সাড়ে চারটায় ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহা. বজলুর রহমানের কাছে আদেশ ও ইস্যু বই নিয়ে আসা হয়। তিনি আদেশ ও ইস্যু বই পর্যালোচনা করেন। আদেশ বইয়ে দেখা যায়, ৩০ নম্বর আদেশটি নাজির পদে প্রত্যাবর্তনের একটি আদেশ। যে আদেশে বর্তমান নাজিরের পদোন্নতির আদেশ বাতিলের কোনো কথা লেখা নেই। ইস্যু বই পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, দায়িত্ব হস্তান্তরের যে চিঠি তাতে স্মারক নম্বর দেওয়া হয়েছে ১২০/জি এবং নাজির পদে পদায়নের যে আদেশটি তাহাতে স্মারক নম্বর দেওয়া হয়েছে ১২১/জি। এরপর বেঞ্চ সহকারী নুরুল হক নাজির পদে একটি যোগদান পত্র ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহা. বজলুর রহমানের কাছে উপস্থাপন করে। তিনি বলেন, যেহেতু জেলা জজ বিকেল ৫টায় দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের পর রাত ১২টায় বাংলোয় বসে এ রকম একটি আদেশ করেছেন, আদেশটির বিষয়ে আমি ভারপ্রাপ্ত জেলা জজ হিসেবে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছি না। আপনারা যার যার জায়গায় কাজ করেন। পরবর্তীতে নতুন জেলা জজ এসে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন। এরপর আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল সোয়া ১০টায় স্থানীয় বারের সভাপতি, সম্পাদকসহ ১৪/১৫ জন অ্যাডভোকেট ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহা. বজলুর রহমানের খাসকামরায় আসেন। আইনজীবীরা ভারপ্রাপ্ত জেলা জজকে উক্ত আদেশ কার্যকর করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তখন ভারপ্রাপ্ত জেলা জজ জানান, তিনি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে। তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। তিনি এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তখন আইজীবীরা উত্তপ্ত হয়ে আঙুল উঠিয়ে উচ্চস্বরে বলেন, আপনি এই আদেশ কার্যকর করবেন কি না বলেন। তা নাহলে আপনার আদেশ বর্জন করা হবে। এবং বারের তরফ হতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসময় সভাপতি অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন ঘুষি মেরে টেবিলের গ্লাস ভেঙে ফেলেন এবং সকলে মিলে ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহা. বজলুর রহমানকে মারতে উদ্যত হন। এমতাবস্থায় জজশিপের কিছু কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বুঝতে পেরে ভারপ্রাপ্ত জেলা জজের যেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। আইনজীবীরা বাঁশের লাঠি, কাঠের বাটামসহ আদালতের প্রধান ফটক দিয়ে আদালতের ভিতরে ঢুকে বিচারকদের উপর আক্রমণ করার চেষ্টা করে। সেখানে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।’ চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জিহাদ ফকরুল আলম খান বলেন, ‘আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে আইনজীবীদের একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এখনো অব্দি কোনো মামলা হয়নি।’


কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী