চুয়াডাঙ্গার দুজনসহ ১১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু
- আপলোড তারিখঃ
১১-০২-২০২১
ইং
ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাক সংঘর্ষ : আহাজারী-কান্নায় বাতাস ভারী
৯ জনের পরিচয় মিলেছে : নিহতদের বেশির ভাগ মাস্টার্সের শিক্ষার্থী
রিয়াজ মোল্যা, কালীগঞ্জ:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাস উল্টে শিশুসহ ১১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে দুর্ঘটনায় পতিত বাসের মধ্য থেকে। আর দুজন মারা গেছেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এছাড়াও ওই বাসের আহত ৩০ জন যাত্রীকে কালীগঞ্জ ও যশোর আড়াইশ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। আহত ও নিহতদের অধিকাংশই মাস্টার্স পরীক্ষার্থী। গতকাল বুধবার বেলা ৩টার দিকে যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের বারোবাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে ৮ জন পুরুষ ২ জন মহিলা ও ১ জন শিশু রয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
স্থানীয় সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার, কালীগঞ্জের ফায়ার সার্ভিস, বারোবাজার হাইওয়ে পুলিশের কর্মীরা ও স্থানীয় লোকজন প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে আহতদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করেন। এবং মৃতদেহ উদ্ধার মর্গে প্রেরণ করে। ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার বিকাল ৩ টার দিকে উপজেলার বারোবাজার তেলপাম্পের সামনে।
কালীগঞ্জ হাসপাতালসূত্রে জানা গেছে, নিহত ১১ জনের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় মিলেছে। এরা হলেন, কালিগঞ্জ সুন্দরপুর গ্রামের ইসহাক আলীর ছেলে মোস্তাাফিজুর রহমান (২৫) ঝিনাইদহের সদর উপজেলার নাথকুন্ডু গ্রামের ওয়াহেদ আলীর ছেলে ইউনুস আলী (২৪) চুয়াডাঙ্গা জেলার ডিঙ্গেদহ গ্রামের আব্দুর রশিদীর মেয়ে রেশমা খাতুন (২৫), চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নগদা গ্রামের জিন্নাত বিশ্বাসের ছেলে শুভ (২২), কালীগঞ্জের রণজিৎ দাসের ছেলে সনাতন দাস (২৫), কোটচাঁদপুর উপজেলার হরিণদিয়া গ্রামের নতুন মসজিদ পাড়ার মীর মোহাম্মদের ছেলে সোহাগ হোসেন (২৫), শৈলকুপার আব্দুল আজিজ (৬০), মাগুরা ড্রাইভার উজ্জল হোসেন (৩৭) ও ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ থানার জগনাথপুর গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে আব্দুল আজিজ (২৭)।
ঘটনাস্থলে স্থানীয় সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার দিনভর উদ্ধার ও লাশ শনাক্তের কাজে সহযোগিতা করেছেন। এর আগে ঘটনাস্থল থেকে তিনি ফায়ার সার্ভিসের কর্মিদের সাথে একটি পিকআপ ভ্যানে মৃতদেহগুলো কালীগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্থানীয় সাংসদ আনার। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথও ছুটে এসেছেন কালীগঞ্জ হাসপাতালে। প্রতিবেনটি লেখা পর্যন্ত মৃতদেহ শনাক্তের কাজ চলছিলো। দূর্ঘটনার পর সড়কের সকল ধরনের যান চলাচল প্রায় ২ ঘন্টা ব্যাপি বন্ধ ছিল।
কালীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ড. মামুনুর রশিদ জানান, খুলনা থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী মাগুরা রোডের একটি বাস যার নাম্বার ঢাকা মেট্রো ব- (১১০২১৪) ঝিনাইদহের উদ্দেশ্য যাচ্ছিল। বাসটি ঝিনাইদহ যশোরের মাঝখানে বারোজার তেল পাম্পের নিকটে পৌছলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সাথে ধাক্কা লাগে। এ সময় দ্রুতগামী বাসটি নিয়ন্ত্রন হারিয়ে মহাসড়কের উপরেই আড়াআড়ি ভাবে উল্টে পড়ে। এ সময় বাসের সকল যাত্রীই রক্তাক্ত আহত হয়। আহতদের চিৎকারে একাবাসী এগিয়ে আসে। এরপর খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মি ও স্থানীয় সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার ঘটনাস্থলে পৌছে বাসের মধ্য থেকে এ পর্যন্ত ৩০ /৩৫ জনকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ ও যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির করা হয়েছে। বাসটির মধ্য থেকে মোট ৯ আর হাসপাতালে মারাগেছেন ২ জন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ মাস্টার্স পরীক্ষা ছিল। কাজেই নিহত আহতদের মধ্যে বেশির ভাগই মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে কালিগঞ্জ সুন্দরপুর গ্রামের ইসহাক আলীর ছেলে মোস্তাাফিজুর রহমান (২৫) এমএসএস ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পরিবারের সবাই অপেক্ষা করছিল তার জন্য। কিন্ত না! তিনি ফিরলেন লাশ হয়ে। সাদা কফিনে মোড়া লাশটি যখন বাড়ির আঙ্গিনায় ফিরলো তখন সবাই বাকরুদ্ধ। চুয়াডাঙ্গার নেহালপুর গ্রামের গৃহবধু রেশমা খাতুনও একই বাসে পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সঙ্গে ছিলেন নগদা গ্রামের শুভ। তিনিও মাষ্টার্স পরীক্ষা দিয়ে মৃত্যু মিছিলের সহযাত্রী হন। এই অকাল মৃত্যুর ফলে তাদের আর পরীক্ষার রেজাল্ট জানা হলো না। ঝিনাইদহের সদর উপজেলার নাথকুন্ডু গ্রামের ওয়াহেদ আলীর ছেলে ইউনুস আলী, কালীগঞ্জের রণজিৎ দাসের ছেলে সনাতন দাস ও কোটচাঁদপুর উপজেলার হরিণদিয়া গ্রামের নতুন মসজিদ পাড়ার মীর মোহাম্মদের ছেলে সোহাগ হোসেন সবাই পরীক্ষা দিয়ে ওই বাসে বাড়ি ফিরছিলেন। এক সঙ্গে ৬ শিক্ষার্থীর মৃত্যু এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কেও ছেলে, ভাই, স্ত্রী ও মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পেড়েছেন। এলাকাবাসীর দাবি দীর্ঘদিন এ সড়কে চলাচলরত অনেক যাত্রীবাহীবাস বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে যাত্রী বহন করে আসছে। যে কারনে প্রায়ই এমন দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। যার কোন প্রতিকার নেই।
কালীগঞ্জ থানার ওসি মাহাফুজুর রহমান মিয়া জানান, হাসপাতালে রেখে লাশ শনাক্তের কাজ চলছে। তবে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। এ পর্যন্ত ৫ জনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিদের শনাক্তের কাজ এখনও চলছে।
স্থানীয় সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার জানান, খবর পেয়েই আমি ঘটনাস্থলে পৌছেছি। আমি দেখেছি মানুষের আহাজারী। আহতদের আকুতি। আমি নিজে, ফায়ার সার্ভিসসহ এলাকার মানুষের সাহায্যে দ্রুত হাসপাতালে পাঠিয়েছি। এরপর সাথে থেকে মৃতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে এসে শনাক্ত ও লাশ হস্তান্তের কাজ চালাচ্ছি। তিনি বলেন, এমন বীভৎস ঘটনায় এলাকার নারী পুরুষ ও আহত যাত্রীদের আহাজারী আর্তনাদে কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে গিয়েছিল। সর্বশেষ মৃতদেহ শনাক্তের জন্য হাসপাতালে থেকে সাহায্য করছি।
কমেন্ট বক্স