দর্শনা কেরুজ চিনিকলের ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দার
দর্শনা অফিস:
আখচাষিদের হতাশা, শ্রমিক-কর্মচারীদের দুঃখ ভরাক্রান্ত মন ও জনসাধারণের আতঙ্কিত মুখ নিয়ে দেশের সর্ববৃহত্তম চিনিশিল্প প্রতিষ্ঠান দর্শনার ঐতিহ্যবাহী কেরুজ চিনিকলের ২০২০-২১ মৌসুমের আখ মাড়াই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বেলা তিনটায় কেরু চিনিকলের কেইন কেরিয়ার চত্বরে আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। দর্শনা কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন।
প্রধান অতিথির বক্তব্য এমপি ছেলুন জোয়ার্দ্দার বলেন, বর্তমানে চিনিশিল্পের নাজুক হাল। চিনিশিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে ধ্বংসের মুখে ধাবিত হচ্ছে। চরম বিপর্যয়ের মুখে দেশের চিনিশিল্প অবস্থান করলেও কেরু অ্যান্ড কোম্পানি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে চিনিশিল্পের প্রধান কাঁচামাল আখ। আখ চাষ না হলে মিল তার কাঁচামাল পাবে না। ফলে কাঁচামাল না পেলে কোনো মিল কারখানা চলবে না। তাই বিশেষভাবে চিনিকল এলাকায় আখচাষিদের বিভিন্ন বাড়তি সুবিধা দিয়ে চিনিকলের পর্যাপ্ত কাঁচামাল তৈরি করতে হবে। তাহলে কোনো মিল বন্ধ হবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজি আলী আজগার টগর বলেন, সরকারের আপ্রাণ চেষ্টা রয়েছে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান যাতে আজীবন টিকে থাকে। তাই প্রতিবছরেই সরকার কোটি কোটি টাকা এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি ও ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে। কেরুজ চিনিকলকে আধুনিকায়ন করতে ইতোমধ্যেই সরকার সাড়ে ৪৭ কোটি টাকার পরিবর্তে রিটেন্ডারের মাধ্যমে ১০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছে। যদি সরকারের কেরু চিনিকল বন্ধ করার ইচ্ছা থাকত, তাহলে রুগ্ন চিনিকলটি আধুনিকায়ন করার জন্য এতগুলি টাকা বরাদ্দ দিত না। আখ চাষ যাতে বাড়ানো যায়, সেদিকে জেলাবাসীকে লক্ষ্য করতে হবে। লোকসানের বোঝা কমাতে শ্রমিক-কর্মচারি ও কর্মকর্তাদের আরওও দক্ষ, কর্মঠ, দূরদর্শিতা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেড কোয়ার্টার) কনক কুমার দাস, চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ উজ্জামান লিটু, দামুড়হুদা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী মুনছুর বাবু, দর্শনা পৌর মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের সহ-সম্পাদক ও কেরুজ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি তৈয়ব আলী, ফেডারেশনের সভাপতি ও শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান, আখচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল হান্নান, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী বিশ্বাস প্রমুখ।
আলোচনা অনুষ্ঠানে চিনিকল কর্তৃপক্ষ চাষিদের আখচাষে উদ্বুদ্ধকরণে প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও জমিতে সর্বোচ্চ আখচাষ করায় দক্ষিণ চাঁদপুর গ্রামের রওশন আলীর ছেলে কেরুজ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি তৈয়ব আলী, পরানপুর গ্রামের কাবিল মণ্ডলের ছেলে ইন্তাজুল ও একর প্রতি সর্বোচ্চ আখ উৎপাদনে ঈশ্বরচন্দ্রপুর গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে শওকত আলীকে আমন্ত্রিত অতিথিদের মাধ্যমে ক্রেস্ট দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা শেষে দোয়া অনুষ্ঠানের পরপরই উপস্থিত অতিথিসহ কেরুজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কেইন কেরিয়ারের ডোঙায় আখ নিক্ষেপের মধ্যদিয়ে মাড়াই মৌসুমের শুভ উদ্বোধন করেন।

এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন কেরুজ চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শেখ শাহাবউদ্দিন, দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুবুর রহমান কাজল, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) শেখ মাহবুবুর রহমান, সমাজসেবক হাজি আকমত আলী, কেরুজ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম প্রিন্স, শ্রমিক নেতা ফিরোজ আহামেদ সবুজ, সাবেক শ্রমিক নেতা হাবিবুর রহমান হবি, সাবেক সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ, শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সহসভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, সহসাধারণ সম্পাদক খবির উদ্দীন, সদস্য হাজি আকরাম হোসেন, বাবর আলী, শরিফুল ইসলাম, সাইফুদ্দিন সুমন, মফিজুল ইসলাম শাহ, হাফিজুল ইসলাম হাফিজ, দামুড়হুদা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল হান্নান ছোট, দর্শনা পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আসলাম আলী তোতা, দামুড়হুদা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফুল ইসলাম মল্লিক, দর্শনা পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ববি ও দর্শনা পৌর আওয়ামী লীগের ১ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি সাবেক কাউন্সিলর জয়নাল আবেদীন নফর। অনুষ্ঠানটি সার্বিক পরিচালনায় করেন কেরুজ মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) গিয়াস উদ্দিন।
উল্লেখ্য, কেরু চিনিকলের কারখানা সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাড়াই মৌসুমে কেরু চিনিকল ১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৯ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চিনিকলের নিজস্ব ১ হাজার ৫৫০ একর জমিতে ২৪ হাজার মেট্রিক টন আখ এবং কৃষকের ৬ হাজার ৯৮২ একর জমির ৯৪ হাজার মেট্রিক টন আখ রয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়ার জগতি চিনিকলের আওতাধীন কৃষকদের ৩৬ হাজার মেট্রিক টন আখ কেরুজ চিনিকলে মাড়াই করা হবে। ফলে এবারের মাড়াই কার্যদিবস নির্ধারণ করা হয়েছে ১০৪ দিন। চিনি আহরণের গড় হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।