বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

কিভাবে পরিকল্পনা আর গ্রেপ্তার?

  • আপলোড তারিখঃ ১৬-১২-২০২০ ইং
কিভাবে পরিকল্পনা আর গ্রেপ্তার?
জীবননগর উথলী সোনালী ব্যাংকে দস্যুতা মেহেরাব্বিন সানভী: ফিল্মি স্টাইলে গত ১৫ নভেম্বর দিনের বেলায় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী বাজারে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত উথলী সোনালী ব্যাংক শাখায় দুর্ধর্ষ দস্যুতার ঘটনা ঘটে। লুট করা হয় ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯০০ টাকা। পুলিশের দক্ষতা, তথ্য প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ফলে পুরো ঘটনার রহস্য উৎঘাটন হয়েছে। এ ঘটনায় সম্পূর্ণ নিজে তদারকি করেছেন পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম। অনন্য দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। কিভাবে জট খুললো আলোচিত এ ঘটনার আসুন জেনে নিই। কেন এবং কিভাবে ব্যাংক থেকে দস্যুতার পরিকল্পনা করে মূল হোতা রাসেল: দস্যুতার মূল হোতা জীবননগর উপজেলার দেহাটি গ্রামের সাফাতুজ্জামান রাসেল (৩০)। স্থানীয় এলাকাবাসীর থেকে চড়া সুদে এনজিও থেকে নেওয়া বড় মাপের ঋণে যেমন তার অবস্থা ছিলো কাহিল, ঠিক তেমনি মাদকের প্রতি আসক্তি ছিলো প্রবল। মাদক ছাড়া যেমন চলতে পারতো না সে, তেমনি প্রতি সপ্তাহে এনজিওর কিস্তিই দিতে হতো ২০ হাজার টাকার কাছাকাছি। দায় দেনায় সে জর্জরিত। সবমিলিয়ে দেনার দায়ে প্রবল হতাশায় ভুগছিলো সে। সংসারে ছিলো না শান্তি। নিজের নেওয়া একটির পর একটি ভুল সিদ্ধান্ত আর দেনায় জড়ানোয় ছিলো এমন অপরাধ করার প্রধান কারণ। প্রাথমিকভাবে পুলিশের কাছে সে জানিয়েছে, জীবননগর উথলী ব্যাংকে তাঁর নিজের, তাঁর মা এবং বাবারও অ্যাকাউন্ট ছিলো। মাঝেমধ্যেই সে ওই ব্যাংকে যেতো। ব্যাংকের সার্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতি ভালোভাবেই জানা ছিলো তাঁর। কখন কখন ব্যাংকে কম মানুষ থাকে। কি ধরণের সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে ব্যাংকে, সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নখদর্পনে নেয় সে। ভারতীয় সিরিয়াল ক্রাইম পেট্রল দেখে ব্যাংক থেকে টাকা লুট করতে পরিকল্পনা করে সে। সিরিয়ালটির বিভিন্ন পর্ব টিভি ও ইউটিউবে দেখে ছককষে লুটের। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার কিভাবে তাকে ধরিয়ে দিবে পুলিশের কাছে এবং কিভাবে সে নিজে তথ্যপ্রযুক্তিকেই কাজে লাগিয়ে ব্যাংক লুটে সহযোগিতা পাবে সবকিছুর পরিকল্পনা করে সে। পরে, সহযোগিতার জন্য হৃদয়, রকি ও আকাশকে দলে সামিল করে। তবে আকাশ সশরীরে লুটে অংশ না নিলেও তার মুখ বন্ধ করতে লুটের টাকার ভাগ দেয় রাসেল। পরিকল্পনা অনুযায়ী দারাজ ডট কম থেকে খেলনা পিস্তল ক্রয় করে চক্রটি। পরে পেপার ফ্লাই কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নিজের নাম বদল করে পিস্তল ডেলিভারি নেয় রাসেল। পিস্তল হাতে পাবার পর গত ১৫ নভেম্বর রাসেল তার ভাইয়ের ছেলে রকি ও হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে হেলমেট, পিপি ও হ্যান্ডগ্লাভস পরে সোনালী ব্যাংক উথলী শাখায় ঢুকে। ``কিভাবে সংঘটিত হয় জীবননগর উথলী ব্যাংকে দস্যুতা: ফিল্মি স্টাইলে গত ১৫ নভেম্বর দিনের বেলায় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলী বাজারে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত উথলী সোনালী ব্যাংক শাখায় দুর্ধর্ষ দস্যুতার ঘটনা ঘটে। ওইদিন দুপুর সোয়া ১টায় প্রথমে একজন পিপিই ও হেলমেট পরিহিত অবস্থায় উথলী বাজারে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের ভেতর প্রবেশ করেন। এর এক মিনিট পর আরও দুজন হেলমেট পরিহিত অবস্থায় ব্যাংকে প্রবেশ করেন। এরপর তারা তিনজন পিস্তল উঁচিয়ে ব্যাংকের দরজা বন্ধ করে দেন এবং ব্যাংকের নিরাপত্তাপ্রহরীসহ সবার ফোন নিয়ে নেন। এরপর তারা ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ও নিরাপত্তাকর্মীসহ ওই ব্যাংকে কর্মরত মোট আটজনকে একটি কক্ষের সামনে বসিয়ে রাখেন। পরে তারা ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত টাকাসহ কাউন্টারে থাকা মোট ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯০০ টাকা লুট করে। টাকা লুটের পর দস্যুতা দলের সদস্যরা দ্বিতীয় তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জরুরি সতর্ক সংকেত (ইমারজেন্সি হুইসেল) বাজান। সতর্ক সংকেত শুনে ব্যাংকের পার্শ্ববর্তী দোকানদাররা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং দস্যু দলকে ধাওয়া করেন। এসময় দস্যু দল পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করার হুমকি দিলে দোকানদাররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন এবং চিৎকার শুরু করেন। এ সুযোগে দস্যু দল মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ট করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় দস্যু দল উথলী সূর্যতোরণ ক্লাবের সামনে গেলে আবার বাধার মুখে পড়ে। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা ৫-৬ জন মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে একটা ইট দস্যু দলের এক সদস্যদের হেলমেটে লাগে। খবর পেয়ে উথলী ক্যাম্পের বিজিবি ও জীবননগর থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দস্যু দলের ফেলে যাওয়া পিস্তলের অংশ বিশেষ উদ্ধার করে। পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামের দক্ষতা, কিভাবে তদন্ত এবং আটক হলেন রাসেল: দস্যুতার ঘটনার পরই চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঢাকা সিআইডির একটি টিমও এ ঘটনায় কাজ করে। উথলী ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দীক বাদী হয়ে জীবননগর থানায় একটি মামলাটি দায়ের করেন। জীবননগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ফেরদৌস ওয়াহিদ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হন। পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম নিজে এ ঘটনায় বার বার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ব্যাংকে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় সমস্যায় পড়ে তদন্ত। পাশের একটি জুয়েলারী থেকে পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম নিজে সংগ্রহ করেন সিসিটিভি ফুটেজ। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত খেলনা পিস্তলের অংশ বিশেষ কাজে লাগিয়ে অনলাইন থেকে পুলিশ সংগ্রহ করে তথ্য। দারাজ ডট কম থেকে খেলনা পিস্তল ক্রয় করে একটি চক্র। পরে পেপার ফ্লাই কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তা ডেলিভারি নেওয়া হয়। কিন্তু অর্ডার একজনের নামে আর ডেলিভারি আরেকজনের নামে নেওয়া হয়। একজনকে আটক করা হয়, কিন্তু তাঁর কাছে কোনো আলামত পাওয়া যায় না। পরে পুলিশকে বেশ বেগ পোহাতে হয়। যাহোক, পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামের বুদ্ধিমত্তায় দস্যুতার মূল হোতা রাসেলের নাম আসে সামনে। তাঁর পালিয়ে থাকা পুলিশকে আরও বেশি তাঁর প্রতি সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। পরে পুলিশ বুঝতে পারে, সে বেশ ধুরন্ধর। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তার অবস্থান নিশ্চিতসহ কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। কিন্তু সে নির্দিষ্ট এক জায়গায় অবস্থান না করায় তাকে ধরতে পুলিশের সমস্যা হয়। একের পর এক তার অবস্থান পরিবর্তন করার কারণে তাকে আটক করতে একমাস সময় লেগেছে পুলিশের। ঘটনার পরে রাসেল প্রথমে ঝিনাইদহতে পালিয়ে যায়। পরে যশোরে পালিয়ে যায়, যশোর থেকে সে ঢাকাতে পালিয়ে যায়। ঢাকা থেকে সে কালিগঞ্জে চলে আসে। পরে আবার চৌগাছায় চলে যায়। পরে আবার চৌগাছা থেকে চুয়াডাঙ্গার উপর দিয়ে মেহেরপুরে যায়। মেহেরপুর থেকে কুলপালাতে একদিন অবস্থান করার পর আবার চৌগাছা চলে যায়। পরে আবার ঢাকাই যায়। ঢাকার সদর ঘাট থেকে লঞ্চের একটি কেবিন ভাড়া করে পটুয়াখালি চলে যায়। পটুয়াখালি যাবার পর বরিশাল হয়ে খুলনায় আসে। খুলনা থেকে আবার যশোর চৌগাছায় আসলে গত সোমবার (১৪ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে পুলিশ তাকে আটক করতে সক্ষম হয়। পরে একই রাতে দস্যু দলের অন্য সদস্য জীবননগর উপজেলার দেহাটি গ্রাম থেকে জাহাঙ্গীর শাহের ছেলে রকি (২৩), মফিজুল শাহের ছেলে মাহফুজ আহম্মেদ আকাশ (১৯) এবং আখতারুজ্জামান বাচ্চুর ছেলে হৃদয়কে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়। দস্যু দলের সদস্যদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ব্যাংক থেকে লুট হওয়া নগদ পাঁচ লাখ ৩ হাজার টাকা এবং দস্যুতার কাজে ব্যবহৃত দুটি খেলনা পিস্তল, দুটি হেলমেট, দুটি চাপাতি, দুটি মোটরসাইকেল এবং পিপিই উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ কেন ডাকাতি না বলে বলছে দস্যুতা: দস্যুতা ও ডাকাতি দেশের আইনে গুরুতর অপরাধ। দুই ধরণের অপরাধের মামলার পার্থক্য রয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৯০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক মৃত্যু বা জখমের ভয় দেখিয়ে বলপূর্বক কোনো বস্তু বা অস্থাবর সম্পত্তি অর্পণে বাধ্য করলে তা দস্যুতা বলে গণ্য হবে।’ দণ্ডবিধির ৩৯১ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ডাকাতি হলো ৫ বা ততোধিক ব্যক্তি মিলিতভাবে কোনো দস্যুতা অনুষ্ঠান করে বা করার চেষ্টা করে সংখ্যায় ৫ বা ততোধিক হয়ে থাকলে এটা ডাকাতি বলে গণ্য হবে।’ অর্থাৎ কোনো অপরাধের সঙ্গে পাঁচজনের কম জড়িত থাকলে তা দস্যুতা এবং পাঁচজন বা ততোধিক ব্যক্তি মিলিত হয়ে যদি অপরাধ করলে তা হবে ডাকাতি। জীবননগরে উথলি ব্যাংকের এ ঘটনায় জড়িত আছে চারজন। তাই পুলিশ এটাকে ডাকাতি না বলে, দস্যুতা বলছে।


কমেন্ট বক্স
notebook

ফুফুর টাকা হাতিয়ে নিতে ভাতিজার ‘ছিনতাই নাটক’