সমস্যার স্তূপে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল!
- আপলোড তারিখঃ
১৪-১২-২০২০
ইং
প্রতিবেদক, মেহেরপুর:
দিন দিন সমস্যার স্তূপে ডুবে যাচ্ছে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল। পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, শয্যা নেই, এমন হাজারো নেই আর নেই-এ ভরা মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল। ফলে জেলাবাসী তাদের মৌলিক অধিকার চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জানা যায়, মেহেরপুর জেলার মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য ১ শ শয্যার জেনারেল হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নত করা হয়েছে। কিন্তু তা শুধু কাগজ কলমে। দীর্ঘ দিনেও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের অবকাঠামোর ন্যূনতম অগ্রগতি হয়নি। বরং দুর্ভোগ বেড়েছে সকলের। এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০০-৩৫০ জন রোগী ভর্তি থাকে। হিসেব মতে যেখানে ১০০ জনের জন্য ৪১ জন ডাক্তার প্রয়োজন, সেখানে মাত্র ১১ জন ডাক্তার এতোগুলো রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন। ফলে রোগীরা সঠিক সময়ে ডাক্তার ও ওষুধ পাননা। হাসপাতালে রোগীর চাপ হলেই বহির্বিভাগের ডাক্তাররা কাজের ওজুহাতে রোগী ফেলে অন্যত্র চলে যান। ফলে গ্রাম থেকে আসা রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে বিনা চিকিৎসায় ফিরে যেতে হয়। এছাড়াও হাসপাতালের পরীক্ষাগারগুলো চলছে মাস্টার রোলের কিছু অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে পরীক্ষা করতে হয়। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার ২৪ ঘণ্টা চালু থাকার কথা থাকলেও ডাক্তার ও নার্সের সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। বেলা একটা বাজতে না বাজতে হাসপাতালে বহির্বিভাগের রোগী দেখা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আগত রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাসপাতালের যে অ্যাম্বুলেস রয়েছে, সেটিও দীর্ঘ দিন ধরে নষ্ট হয়ে রয়েছে। হাসপাতালের খাবার মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
হাসপাতালের ঠিকাদার প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের লোক হওয়ায় খাবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা নেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। রোগীদের পানি পান করার জন্য কোনো ডিপটিউবয়েল বা ওয়াটার সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা হাসপাতাল থেকে ১ কিলোমিটার দূরে যেয়ে অন্যের বাড়ি অথবা দোকান থেকে পানি নিয়ে আসতে হয়। এত বড় হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নের জন্য পরিচ্ছন্নকর্মী রয়েছেন মাত্র তিনজন। ফলে হাসপাতালকে জীবাণুমুক্ত পরিচ্ছন্ন রাখতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাসপাতালে রোগীদের দেখভাল ও হাসপাতালের নিরাপত্তাজনিত কাজে ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। বছরের পর বছর এরা বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিচ্ছেন। সেবা শেষে রোগীদের বকশিসই এদের আয়ের উৎস। অভিযোগ রয়েছে এই সকল স্বেচ্ছাসেবকদের ধমকানিতে অস্থির রোগী ও রোগীর স্বজনেরা। তাদের ঠিক মতো খুশি করতে না পারলে রোগীর কপালে নেমে আসে দুর্ভোগ।
মেহেরপুর শহরের শাহআলম অভিযোগ করে বলেন, মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা তলানিতে ঠেকেছে। এখানে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। আবার সেবা প্রাপ্তি বা কোনো বিষয়ে কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে জেলার বাইরে রেফার্ড করা হয়। এক রোগীর স্বজন খুশি আক্তার বলেন, ‘গত পরশু দিন আমার বোন শেফালীকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু কোনো চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতাল থেকে আজ রিলিজ নিয়ে ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছি।’
অপর রোগীর স্বজন নাইম গাজী বলেন, ‘অসুস্থ অবস্থায় আমার বাবাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর আমার বাবার মৃত্যু হয়। কিন্তু হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক সেটা গোপন করে আমার বাবাকে কুষ্টিয়া মেডিকেলে রেফার্ড করে। পরে আমার এক আত্মীয় বিষয়টি বুঝতে পেরে কর্তব্যরত ডাক্তারকে চার্জ করলে তিনি ভুল স্বীকার করেন। এর কিছুক্ষণ পর আমার বাবার ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।’
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মোকলেছুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে যেমন ঠিক, তেমনি সীমিত লোকবল নিয়ে আমরা আমাদের সেবা প্রদান অব্যাহত রেখেছি।’
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক মাস হলো এখানে এসেছি। প্রথম যে দিন জয়েন্ট করি, সে দিন হাসপাতালের পরিবেশ দেখে আমার নিজেরই চোখের পানি বের হয়েছিল এ কোথায় আসলাম। হাসপাতালের পরিবেশের উন্নয়ন করছি। ইতোমধ্যে হাসপাতালকে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। হাসপাতালে এখন আর রুমাল নাকে দিয়ে ঢোকা লাগে না। হাসপাতাল চত্বরে কোথাও কোনো আবর্জনা পাবেন না। দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মেহেরপুর হাসপাতাল এখন দালালমুক্ত, এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক ও অন্যান্য সমস্যা নিয়ে ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পত্র দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ২-৩ মাসের মধ্যে হয়ত সমাধান করবেন।
কমেন্ট বক্স