এনসিটিবির বদলি আতঙ্ক : পাঠ্যবইয়ের ভুলের জন্য : সচিবসহ ৬ কর্মকর্তাকে বদলি
- আপলোড তারিখঃ
০৫-০৪-২০১৭
ইং
নিজস্ব প্রতিবেদক: পাঠ্যবইয়ে ভুলের জন্য দায়ী ছয় কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে নতুন কর্মস্থল ঠিক করে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়াও চলছে। ভুলের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে এ সিদ্বান্ত নিতে নেয়া হচ্ছে। জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে দুই কর্মকর্তা গতকাল বুধবার বিদায় নিয়েছে। অন্যদের আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে বিদায় নিতে হবে। এ নিয়ে আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো শিক্ষামন্ত্রণালয়। তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গতকাল পর্যন্ত ২৩ জন কর্মকর্তা এনসিটিবিতে বহাল-তবিয়তে আছেন। তাদেরকেও পর্যায়ক্রমে বদলি করা হবে বলে জানা গেছে। গতকাল এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নানকে ঝিনাইদহের সরকারি কেসি কলেজে বদলি করা হয়েছে। সম্পাদক গৌরাঙ্গ লাল সরকারকে নোয়াখালীর হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে পাঠানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক মোসলেউদ্দিন সরকার এবং হাননান মিঞাকে যথাক্রমে পটুয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে। আজকের মধ্যে তাদের এনসিটিবি ছাড়তে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগে বুধবার রেবেকা সুলতানাকে রাজধানীর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া এনসিটিবিতে নানা নেতিবাচক ঘটনার দায়ে সংস্থাটির সচিব ইমরুল হাসানকেও বুধবার স্ট্যান্ডরিলিজ করা হয়েছে। তাকে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে। এ দুজন কর্মকর্তা গতকালই এনসিটিবি ছেড়েছেন। এদিকে পাঠ্যবইয়ে ভুলের জন্য গত জানুয়ারিতে এনসিটিবির তৎকালীন প্রধান সম্পাদক প্রীতিশ কুমার সরকার ও বিশেষজ্ঞ লানা হুমায়রা খানকে ওএসডি করা হয়েছে। পাঠ্য বইয়ের ভুলের জন্য শিক্ষামন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক) রুহি রহমান বলেন, পাঠ্য বইয়ের ভুলের জন্য জড়িতদের চিহ্নিত করেছি। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুুপারিশ করেছি। এনসিটিবিতে পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ ২০ বছর ধরে যেসব কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। এসব কর্মকর্তার ব্যাপারে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, দীর্ঘদিন কর্মরত থাকলেও তারা পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেননি। এ ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতারও অভাব আছে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে এক ধরনের ঔদ্ধত্য তৈরি হয়েছে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরতদের বদলির সুপারিশ করেছি। এনসিটিবি সূত্র জানায়, এনসিবিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রয়ক অধ্যাপক আব্দুল মজিদ ২০১১ সালের ১০ই অক্টোবর থেকে বোর্ডে কর্মরত আছেন। বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোশতাক আহমেদ ভূঁইয়া ২০১১ সালের ৩১শে মার্চ থেকে। ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ সৈয়দ মাহফুজ আলী ২০০৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর থেকে। বিশেষজ্ঞ চৌধুরী মুসাররাত হোসেন ২০০৯ সালের ১৬ই নভেম্বর থেকে। জুবেরী আলেয়া আক্তার ২০০৭ সালের ১৬ই এপ্রিল থেকে। ফরহাদুল ইসলাম ২০০৮ সালের ১৩ই মে থেকে। বিশেষজ্ঞ আব্দুর রহিম ২০১২ সালের ২৫শে মার্চ থেকে। বিশেষজ্ঞ মনিরা বেগম ২০০৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বরর থেকে। ড. আব্দুল আজিজ ফয়সাল ২০১৩ সালের ২৪শে জুলাই থেকে কর্মরত। শাহীনারা বেগম ২০০৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর থেকে। মো. মঞ্জুরল আলম ২০১০ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি থেকে। পারভেজ আক্তার ২০০৭ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে। মো. মোস্তফা সাইফুল আলম ২০০৯ সালের ১লা ডিসেম্বর থেকে কর্মরত। মো. সাইদুজ্জামান ২০১২ সালের ১৭ই অক্টোবর থেকে কর্মরত। হাসনাত মনোয়ার ২০০৬ সালের ১৪ই মার্চ থেকে কর্মরত। সম্পাদকদের মধ্যে দিলরুবা আহমেদ ২০১৩ সালের ২৪ই জুলাই থেকে কর্মরত। নূর মোহাম্মদ ২০০৯ সালের ১৫ই নভেম্বর থেকে কর্মরত। গবেষণার দায়িত্বে থাকাদের মধ্যে অধ্যাপক মারুফা বেগম ২০০৪ সালের ২৭শে জুলাই থেকে এনসিটিবিতে কর্মরত। কানিজ ফৌজিয়া ২০০৯ সালের ১৫ই নভেম্বর থেকে কর্মরত। জারিয়াতুল হাফসা ২০০৫ সালের ২০শে জুন থেকে কর্মরত। মো. আবু সালেক খান ২০১১ সালের ১৪ই মার্চ থেকে কর্মরত। শাহ তাসলিমা সুলতানা ২০০৬ সালের ৯ই মার্চ থেকে কর্মরত। আবু হেনা মাশুকুর রহমান ২০০৯ সালের ৫ই জানুয়ারি থেকে কর্মরত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এনসিটিবি ‘সোনারখনিতে’ পরিণত হয়েছে। এখান থেকে কেউ সরতে চান না। ঢাকায় থাকার পাশাপাশি সেখানে ‘আর্থিক সুবিধাও’ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি। প্রতি বছর প্রায় হাজার কোটি টাকার বইয়ের কাজ হয়। এসব থেকে কমিশন, নোট গাইড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণসহ নানা সুবিধা নিয়ে থাকেন। এছাড়া বছরে সাতটি বোনাস পান। এ কারণেই তারা স্বপদে বহাল থাকতে নানাভাবে তদবির করছেন। তিনি আরো বলেন, এসব কর্মকর্তার মধ্যে অনেকেই এনসিটিবির কাজের জন্য উপযুক্ত নন। তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হলেও একেকজন বিশেজ্ঞ, গবেষকের পদ দখল করে আছেন। যে কারণে বই সম্পাদনা, পরিমার্জনে প্রতি বছর ভুল হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) ড. মোল্লা জালাল উদ্দিন বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দায়ীদের বদলি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। আরো অন্তত দুই ডজন কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলির চিন্তাভাবনা চলছে বলে তিনি জানান।
কমেন্ট বক্স