আওয়াল হোসেন/ওয়াসিম রয়েল বড়বলদিয়া থেকে ফিরে: দামুড়হুদা উপজেলার বড়বলদিয়া গ্রামের ঘরে ঘরে এখনো কান্নার রোল থামেনি। স্বজন হারনো বুকফাটা হাঁহাকার বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যাদের সাথে দুইদিন আগে এক সাথে থেকেছে, খেয়েছে এবং এক সাথে ঘুমিয়েছে। এসব স্মৃতি যেন কিছুতেই ভুলতে পারছে না। শুধু হতাশায় দিন গুনছে মাঝে মাঝে আচমকা কেঁদে কেঁদে উঠছে। কেউ কেউ মনে করছেন আবার আগের দিনগুলো যদি ফিরে আসতো। এমনি হাজারো প্রশ্ন তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। এমনই বাবুল মিয়ার ছেলে নিহত শফি উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেলো তার একমাত্র বড় আদরের ছেলে আলিফ (১০) এর বুকফাঁটা কান্না। আমি আব্বার কাছে যাবো, আমার আব্বাকে এনে দাও, আব্বা আমার দোকানে নিয়ে যাবে। আব্বার সাথে চা-বিস্কুট খাবো। এসময় পাভীনা এসে কান্না জড়িত কন্ঠে বলে ওরে আমিই তোর মা, আমিই তোর বাবা। কোন বুঝই যেন আলিফ মানতে পারছে না। হাউমাউ করে কাঁদছে, আর এক নাগাড়ে বাবাকে ডেকে চলেছে। এমনভাবে ইন্নাল হোসেনের ছেলে নিহত আকুব্বার আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে সুমন তার বাবার মৃত্যুতে বিছানাগত হয়ে পড়েছে। আর একজন ঠান্ডু মিয়ার ছেলে নিহত বিল্লাল হোসেন সংসারের একমাত্র উর্পাজনকারী হওয়ায় স্ত্রী আসমা খাতুন ছেলে আসাদ (১০) ও মেয়ে বিউটি (১২) কে নিয়ে স্বামীকে হারিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছে। তার আর্তনাদে আকাশ বাতাশ ভারি হয়ে উঠেছে। এছাড়াও রহিম বক্সের ছেলে নিহত আব্দার আলীর তিন ছেলে-মেয়ে সাগর (১৪), ২য় শ্রেণীর ছাত্রী পলি ও শাপলাকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ফকির চাঁদের ছেলে নিহত লাল চাঁদও সংসারের একমাত্র উর্পাজনকারী, অন্যের ভিটায় তাদের বসবাস। তার স্ত্রী ছেলে ইকবাল হোসেন (১৬) ও ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র শামীম (১১) কে নিয়ে চরম হতাশার মাঝে পড়েছে। ভুলাই মন্ডলের ছেলে নিহত বিল্লাল হোসেনের স্ত্রী সাবিনা খাতুন তার একমাত্র ছেলে সোয়ান (১০) কে নিয়ে সামনে দেখছে গহীন অন্ধকার। আরও একজন রমজান আলীর ছেলে নিহত রফিকুল ইসলাম সংসারের একমাত্র উর্পাজনকারী হওয়ায় তার মৃত্যুতে স্ত্রী ৩মেয়েকে নিয়ে গভীর সংকটে। এদিকে লিয়াকত আলী দুই ছেলের মধ্যে শাহিন (১৭)কে হারিয়ে পথে পথে কেঁেদ বেড়াচ্ছে। সময়ের সমীকরণের সাংবাদিক আওয়াল হোসেনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাদঁতে থাকে সে। কে থামাবে কার কান্না। হাফিজুল ইসলাম এর দুই ছেলে উজ্জল (১২) ও ছোট ছেলে সিয়াম (৬)। খোদা বক্স’র ছেলে জজ মিয়ার এক ছেলে এক মেয়ে ফাহাদ(৪)ও টুম্পা (৯)। নজির আলীর ছেলে দূর্ঘটনায় নিহত কিতাব আলীর দুই মেয়ে এক ছেলে। ২ মেয়ে বড়, ছেলে হাবিবুর রহমান (১৭) এইসএসসি পরীক্ষার্থী। পিতার মৃত্যুতে শোকে শয্যা নিয়েছে সে। এমনই এক বেদনা-বিধুর পরিবেশ গোটা বড়বলদিয়া গ্রামজুড়ে। এদিকে দূর্ঘটনায় নিহত শান্ত’র (১৭) পিতা গাজীউর রহমান রাজশাহী মেডিকেলে মৃত্যুশয্যায়। শান্ত ৫ মাস আগে মদনা আব্দুল মালেকের মেয়ে রোকসানার সাথে বিয়ে করে। এই দূর্ঘটনায় অল্প বয়সে সে এখন বিধবা হয়ে গেলো। এছাড়া নাসীর উদ্দিনের দুই ছেলে শফি উদ্দিন ও কালু মিয়া আহত হয়ে রাজশাহী হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। কালু মিয়ার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। ফরজ আলীর ছেলে কটা পা ভেঙ্গে কোনমতে জীবন নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। এভাবে ১৩টি পরিবারের একমাত্র উর্পজনকারী ব্যক্তিরা সবাই মারা গেছে। অপর দিকে আহত পরিবারগুলোও এখন ভবিষ্যৎ পঙ্গুত্বের অপেক্ষায় দুর্বিসহ জীবন যাপন করছে। আর একজন আনোয়ার হোসেনের ছেলে মজিবর রহমান আহত হয়ে হাসপাতালে। এ নিয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাঁসপাতালে ৪জন এবং রাজশাহী হাঁসপাতালে ৪জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। ফলে এসব পরিবারগুলো তাদের সংসার ও ছেলে মেয়েদের লেখাপাড়ার খরচ কিভাবেই বা যুগাবে, কিভাবে টেনে নিয়ে যাবে জীবন-তা এখন কেবলই ধুয়াশা। উল্লখ্য গত ২৬মার্চ সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ২৫জন আলমসাধু ভর্তি যাত্রী নিয়ে বালিভর্তি ট্রাকে সাথে মুখোমুখি সংর্ঘষে ১৩জন নিহত হয় এবং ১২জন আহত হয়ে বিভিন্ন হাঁসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন