সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই এ উদ্যোগ -এমডি আবু সাঈদ
- আপলোড তারিখঃ
২০-০৭-২০২০
ইং
৪ মাসে কেরুজ ডিস্টিলারিতে পৌনে ৩ কোটি টাকার হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন
ওয়াসিম রয়েল, দর্শনা:
চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে স্বল্পমূলে বাজারে ছাড়া এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান দর্শনা কেরুজ চিনিকলের ডিস্টিলারিতে উৎপাদিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার। করোনাভাইরাসের কালো থাবায় সারা বিশ্ব যখন আক্রান্ত, তখন থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিষেধক তৈরিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনো পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশ এ মরণব্যাধি কোভিড-১৯ এর স্থায়ী প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেনি। তবে এ ভাইরাস থেকে প্রতিকার পেতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানসহ দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ সচেতনতার বানী বিদ্যামান রেখেছে। সেই সঙ্গে মানব দেহে যাতে কোনো জীবাণু প্রবেশ না করতে পারে, সে জন্য শরীরের বাহ্যিক অংশে ব্যবহারের বেশ কিছু উপকরণের পরামর্শও দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর মধ্যে উল্লেখ্য (পিপিই, মাস্ক, হাত ধৌত করার জন্য বিভিন্ন প্রকার জীবাণুনাশক সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার)। যেহেতু ভাইরাসটি নাক, মুখ ও হাত দিয়ে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে তাই মুখে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এছাড়া প্রতিকারের জন্য হাত পরিস্কার ও ভাইরাস মুক্ত রাখতে বার বার জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
করোনাভাইরাস রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মধ্যে সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হাত পরিস্কার রাখার জন্য দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জীবাণুনাশক ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরপরই দেশে জীবাণুনাশক হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সংকট দেখা দেয়। এরই একপর্যায়ে ব্যাপক চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন বেসরকারি ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলো হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন ও অধিক মূল্যে বাজারজাতকরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এরপরও প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। এমন দুঃসময়ের মধ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের একমাত্র ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দর্শনা কেরুজ চিনিকলের ডিস্টিলারি বিভাগ ইথাইনাল, ডিস্টিল ওয়াটার, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কালার এবং ফ্লেবারের সমন্বয়ে শতভাগ জীবাণুশাক হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আলী আনসারী বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের মৌখিক অনুমতি নিয়ে কিছু স্যাম্পল পাঠান সদর দপ্তরে। পরে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সঙ্গে কেরুজ হ্যান্ড স্যানিটাইজারের পার্থক্য নির্ণয় করে বাজারজাতকরণের অনুমতি প্রদান করে সদর দপ্তর। অনুমতি পেয়ে মিল কর্তৃপক্ষ গত ২৩ মার্চ সোমবার সকাল ১০টা থেকে ডিস্টিলারি বিভাগের ঔষধাগারে শুরু হয় উৎপাদন। প্রথম দিনেই স্বল্প পরিসরে কেরুজ হ্যান্ড স্যানিটাইজার নামে ৬০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে পরীক্ষামূলকভাবে (একশত) মি. লিটারের ৩ হাজার বোতল উৎপাদন করে বাজারে ছাড়ে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের উদ্যোগ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, টিভি চ্যানেলসহ গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে হৈ চৈ পড়ে যায়। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের চাহিদা দিতে শুরু করে কেরুজ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু ব্যাপক চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের প্রয়োজনে বোতল ও জনবলের অভাবে অনেকটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় এ প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে। তবে পর্যায়ক্রমে কর্তৃপক্ষ সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন চলমান রেখেছে। গত ২৩ শে মার্চ ২০২০ তারিখ থেকে চলতি মাসের ১৮ই জুলাই পর্যন্ত মানে প্রায় ৪ মাসে কেরু এন্ড কোম্পানি হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন করেছে ৫৭ হাজার ১৬৪ লিটার। যার বাজার মূল্য ২ কোটি ৮৪ লক্ষ ৮২ হাজার টাকা। এর মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৫০ হাজার ৭০১ লিটার। যার বাজার মূল্য ২ কোটি ৫৩ লক্ষ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। কারখানায় বর্তমানে মজুদ রয়েছে ৬ হাজার ৪৬৩ লিটার। যার বাজার মূল্য ২৩ লক্ষ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা।
এ বিষয়ে কেরুজ মহাব্যবস্থাপক ডিস্টিলারি (কেমিস্ট্র) ফিদা হাসান বাদশা বলেন, ‘করোনা সংকটে সদর দপ্তরের নির্দেশে ইথাইনাল, ডিস্টিল ওয়াটার, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, কালার এবং ফ্লেবারের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়, কচি কলাপাতা রঙের কেরুজ হ্যান্ড স্যানিটাইজার। যার মধ্যে উপাদান রয়েছে ৭০ ভাগ ইথাইনাল, ২৫ ভাগ ডিস্টিল ওয়ার্টার, ২ ভাগ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও ৩ ভাগ কালার-ফ্লেবার। কেরুজ এ হ্যান্ড স্যানিটাইজার মানব দেহের বাইরের অংশের যেকোনো ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে শতভাগ জীবাণুমুক্ত করতেও সক্ষম।’
এ বিষয়ে কেরুজ মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শেখ শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘মানুষের হাত থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। হাতকে সুরক্ষা বা জীবাণুমুক্ত রাখতে সব থেকে নিরাপদ হচ্ছে কেরুজ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। একমাত্র কেরুজ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের মাধ্যমে শতভাগ জীবাণুমুক্ত থাকা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বল্প মূল্যে এ হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রয় হচ্ছে।’
এ বিষয়ে কেরু এন্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদ বলেন, ‘করোনাভাইরাসে যখন গোটা দেশের মানুষ চিন্তিত, কীভাবে সুরক্ষিত থাকা যায় তা নিয়, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের কেরুজ চিনিকল প্রতিষ্ঠানের ডিস্টিলারি বিভাগের ওষুধ কারখানা শাখা কর্তৃক হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। গোটা দেশের মানুষ যখন লকডাউনে পড়ে নাজেহাল অবস্থায়। এক শ্রেণির দিনমজুর মানুষ কর্মক্ষম হয়ে অভাবগ্রস্থতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিল। তাদের কাছে জীবাণুমুক্ত থাকাটায় বড় কষ্টের ব্যাপার ছিল। এদিকে সুবিধাবাদি কিছু বেসরকারি ঔষধ প্রতিষ্ঠান জীবাণুনাশক হ্যান্ড স্যানিটাজারের মূল্য বাড়িয়ে বাজারে সংকটাপন্ন অবস্থার সৃষ্টি করে, ঠিক সে সময় বিষয়টি উপলদ্ধি করে দর্শনার ঐতিহ্যবাহী কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ স্বল্পমূল্যে কেরুজ হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজারজাত শুরু করে। যাতে মানুষ ক্রয় করে নিজের হাত দুটি জীবাণুমুক্ত রাখতে পারে এবং করোনা থেকে বাঁচতে পারে।’ তাই দেশের সংকটময় মুহূর্তে বাণিজ্যিক বিষয়কে গুরুত্ব না দিয়ে, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কর্তৃপক্ষ সেসময় কেরুজ হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদনের এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন।’ সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারাটাই এ প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকতা বলেও জানান তিনি।
কমেন্ট বক্স