মেলেনি সমাধান, ‘ওনারা এলেন, আগের গানই গাইলেন’
- আপলোড তারিখঃ
১৬-০৭-২০২০
ইং
চুয়াডাঙ্গায় বিদ্যুতের সমস্যা, মন্ত্রী পর্যায়ের তদবিরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় এবারের গ্রীষ্মকালজুড়ে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ থাকবেই। তবে আগামী গ্রীষ্মকালে এমনটি না হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জাফরপুর জাতীয় সাব গ্রিড স্টেশনে চুয়াডাঙ্গায় বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ সমস্যার সমাধানকল্পে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক সভা শেষে এমনটিই জানানো হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের তদবিরের পর তড়িঘড়ি করে বিদ্যুত বিভাগের কর্মকর্তারা এ বৈঠক করেন। বৈঠক সম্পর্কে অনেকেই বলছেন, ‘তাঁরা এলেন, বসলেন আর আগের গানই আবার গাইলেন।’
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গায় গত কয়েকমাস ধরে বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ চলছে। ফলে জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক অস্বস্তি। এ লো-ভোল্টেজের কারণে বাড়ির ইলেক্ট্রনিক জিনিস থেকে শুরু করে কৃষকের সেচ পাম্প পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৌরসভার পানি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে। নষ্ট হয়েছে কয়েকটি পাম্পের মোটর। বিশেষ করে সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত শহরে একেবারেই বিদ্যুতের ভোল্টেজ থাকছে না। বিষটির সমাধানকল্পে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পৌর মেয়রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। এরপরও বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজ কমেনি। চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলীও তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। একাধিকবার মানসম্পন্ন ভোল্টেজে বিদ্যুত সরবরাহের জন্য অনুরোধ করেছেন। তবে তাতেও চুয়াডাঙ্গাবাসী মানসম্পন্ন ভোল্টেজে বিদ্যুত পায়নি। সমাধান হয়নি এ বৃহৎ সমস্যার। অপর দিকে, বিষয়টি জনজীবনে অস্বস্তি সৃষ্টি করলে বিশেষ উদ্যোগ নেন চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান ও বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব কর্মাস সিঙ্গাপুরের (বিডিচ্যাম) সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহিদুজ্জামান টরিক। তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করলে মন্ত্রী অতিদ্রুতই এ সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন। তিনি বিদ্যুত বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশনা পেয়েই গতকাল চুয়াডাঙ্গা জাফরপুর জাতীয় সাব গ্রিড স্টেশনে এক জরুরি সভা করেন বিদ্যুত বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এ সভায় ভেড়ামারা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর এইচভিডিসি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু রায়হানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন পিজিসিবি ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঈনুদ্দিন, মেহেরপুর ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী আব্দুল আজিজ, মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতির জিএম নূর মোহাম্মদ, ডিজিএম যতিন মল্লিক, চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকোর সহকারী প্রকৌশলী আহসান হাবিব, জাফরপুর জাতীয় সাব গ্রিড স্টেশনের সহকারী প্রকৌশলী মারজান আল জান্নাত, উপসহকারী প্রকৌশলী মনির হাসান, উপসহকারী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান প্রমুখ।
প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা চলে। তবে দীর্ঘক্ষণের আলোচনা আর সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদবিরেও আশানুরুপ ফল পায়নি চুয়াডাঙ্গাবাসী। আলোচনা শেষে এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিজিসিবি ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান জানান, ভেড়ামারা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) থেকে জাফরপুরে জাতীয় সাব গ্রিড স্টেশনের সঞ্চালন লাইনে ১৩২ কেভি সরবরাহ করার কথা। কিন্ত ১৩২ কেভি সরবরাহ দিলেও ড্রপআউটের ফলে জাফরপুর গ্রিড স্টেশন পাচ্ছে ১১০ কেভি। এ কারণে জাফরপুর গ্রিড ওজোপাডিকোর বিতরণ লাইনে ৩৩ কেভি সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকো বিতরণ কেন্দ্র লো-ভোল্টেজ পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আসলে আমরা পিক আওয়ার ধরি সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা। এ সময় বাসা-বাড়ি থেকে শুরু করে প্রায় সবাই টিভি, ফ্রিজ, লাইট, ফ্যান, এসি সবকিছুই একসঙ্গে চালান। এই সময়টিতে দুটি বিষয় একসঙ্গে মিশে যাওয়ায় লো-ভোল্টেজ থাকে।’ তিনি আরও বলেন, এই সমস্যার সমাধান করতে ভেড়ামারা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ২৩০/১৩২ কেভির সুপার গ্রিড স্টেশন স্থাপনের জন্য ৬ অর্থবছরের একটি প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়। গ্রিড স্টেশনের কাজটি করছে ভারতের সিমেন্স নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
গত ২০১৫ সালে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ সড়কের চুটলিয়া তেঁতুলতলা নামক স্থানে ১৬.৪ একর জমির ওপর কয়েক শত কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩০/১৩২ কেভির সুপার জাতীয় গ্রিড স্টেশনের অবকাঠামোসহ অন্যান্য নির্মাণকাজ শুরু হয়। নতুন এই গ্রিড স্টেশনটির কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা আছে ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ইতোমধ্যে গ্রিড স্টেশনের প্রায় ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দেশে করোনা মহামারির কারণে গ্রিডের নির্মাণকাজ থেমে আছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রিড স্টেশনের কাজ শেষ হলে পিজিসিবি প্রজেক্ট ডিভিশন পিজিসিবির (সঞ্চালনের) কাছে হস্তান্তর করতে পারবে। আমরা আশা রাখছি আগামী গ্রীষ্মকালে এ সমস্যা আর থাকবে না।’
তবে বৈঠকের খবর শোনার পর চুয়াডাঙ্গার সচেতন মানুষেরা বৈঠকটি ফলপ্রসু নয় আখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিভাগ যে বক্তব্যটি দিচ্ছে, সেটি অনেক আগের কথা। যেটি আগেই নির্ধারণ ছিল। ঝিনাইদহের গ্রিড স্টেশনের কাজটি ২০১৫ সালে শুরু হয়েছে। সুতরাং সরকারি টাকা খরচ করে তড়িঘরি করে এ মিটিং এর কোনো লাভ হয়নি!
কমেন্ট বক্স