কোরবানির জন্য প্রস্তুত ১ কোটি ১৯ লাখ পশু
- আপলোড তারিখঃ
১১-০৭-২০২০
ইং
করোনার ধাক্কায় বেচাকেনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
একদিকে করোনা মহামারি অন্যদিকে কড়া নাড়ছে মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ। ঘরবন্দী রোজার ঈদের পর কোরবানির ঈদ নিয়েও শঙ্কা কাটছে না। তবে ত্যাগের এই ঈদে কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত দেশী পশু প্রস্তুত থাকলেও বিক্রি নিয়ে শঙ্কা আর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিরা। ঈদের জন্য এক কোটি ১৯ লাখ গবাদি পশু প্রস্তুত রয়েছে। তবে করোনায় পশু পরিবহন, ক্রেতা সমাগম ও দাম ঠিকমতো পাবেন কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন খামারি ও বিক্রেতারা। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ ও সব ধরনের সহায়তার কথাও বলা হচ্ছে। তবুও খামারিদের শঙ্কা যেন কাটছে না।
এবারও কোরবানিতে পশু নিয়ে কোন শঙ্কা নেই। দেশের খামারিদের প্রস্তুত করা চাহিদার চেয়ে ১০ লাখের মতো বেশি পশু আছে। ভারতীয় পশুও আনা হবে না। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে দেশে ১ কোটি ১৯ লাখ পশু রয়েছে আর কোরবানি হতে পারে ১ কোটি ১০ লাখের মতো। গতবার ১ কোটি ৬ লাখ কোরবানি হয়েছিল। ফলে দেশের পশুই মেটাবে কোরবানির চাহিদা। তবে এবার বিক্রি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে খামারিদের। করোনার থাবায় খামারি থেকে পশু ব্যবসায় যারা জড়িত সবার হিসেবই যেন পাল্টে গেছে। গত প্রায় ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কোরবানির জন্য পশু হৃষ্টপুষ্টকরণ শুরু করেন দেশের খামারিরা। অনেকে কোরবানিতে পশু বিক্রি করে আবার পরের বছরের জন্য প্রস্তুতি নেন। এবার দেশে চার মাসের বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এতে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কপালে। অনেকের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যবিত্ত অনেকেই যারা বরাবর পশু কোরবানি দেন এবার নাও দিতে পারেন। এতে পশু বিক্রি কম হলে পশুর দামও কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে খামারিদের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারিদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন উদ্বেগ ও পশু বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানা গেছে। সাধারণত ঈদের প্রায় এক মাস আগে থেকেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটগুলোতে নিয়মিত বেপারি ফড়িয়াদের আনাগোনা থাকলেও এবার এখনও সেরকমভাবে শুরু হয়নি। এতে আরও দুশ্চিন্তা বেড়েছে খামারিদের।
পশু কোরবানি কম হওয়ার আশঙ্কা
অন্যান্য বছরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ঈদ-উল-আজহা পালন করলেও এবার সে রকম হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। করোনায় বিশাল একটি জনগোষ্ঠী এখন আর্থিকভাবে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। তারা এবার পশু কোরবানির কথা ভাবতেই পারছেন না। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত যারা একাধিক পশু কোরবানি দিতেন, তারাও এবার পশু সংখ্যা কমাবেন। অনেকেই এবার করোনাজনিত কারণে পশু হাটে যেতে অনাগ্রহী। সব মিলিয়ে এবার পশুর চাহিদা থাকবে কম বলে মনে করছেন অনেকেই। এবার সারাদেশে পশু হাটের সংখ্যা কমেছে। আগ্রহী ইজারাদাররা হাটের ইজারা মূল্যও কমিয়ে দিয়েছেন। ডেইরি ফার্মারস এ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে দেশে সারা বছরে যত গবাদিপশু বিক্রি হয়, তার অর্ধেকেরও বেশি হয় কোরবানির পশুর হাটে। দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগে সারাদেশে দিনে ৪৫ কোটি টাকার গরু কেনাবেচা হয়েছে। সাধারণত মাংস বিক্রির জন্য কসাইদের কাছে এসব গরু বিক্রি হয়। কিন্তু গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দিনে গড়ে ১০ কোটি টাকার বেশি গরু কেনাবেচা হয়নি। ডেইরি ফার্মারস এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান বলেন, শিক্ষিত তরুণরা ইদানিং গবাদিপশুর খামার গড়ে তুলেছেন। ভাল লাভ পাওয়ায় সাধারণ কৃষকেরাও গরু-ছাগল লালন-পালন বাড়িয়ে দিয়েছেন। করোনায় গত কয়েক মাসের অবিক্রিত গরু-ছাগলও কোরবানির ঈদে যুক্ত হবে। করোনা পরিস্থিতি চলতে থাকলে হাটেও ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম কম হতে পারে। আর্থিক মন্দা, করোনায় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিসহ নানা কারণে অন্যান্য বারের চেয়ে এবার কোরবানি ২০ শতাংশের মতো কম হবে। বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইউটিউবার এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান আজিম বলেছেন, গত বছর কোরবানির পশুহাটগুলোতে প্রচুর গরু অবিক্রীত ছিল। এবার আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছে, অনেকেই কোরবানি দিতে পারবেন না। কারণ, অনেকে এখন চাকরিহীন, নিম্নবিত্তরাও কর্মহীন। যারা আট-দশটা পশু কোরবানি দিতেন, তারা দু-তিনটা দেবেন। অনেকে কোরবানির জন্য বাজেট কমাবেন।
এদিকে, করোনা পরিস্থিতিতে সরকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। ইতোমধ্যেই কোরবানির পশু ও বাজার নিয়ে বৈঠক করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন গত বছরের মতো এবারও চাহিদার চেয়ে প্রস্তুত রয়েছে কয়েক লাখ বেশি কোরবানিযোগ্য পশু। পশুর সঙ্কট হবে না এবারও। নানা প্রান্তের খামারিদের সুবিধার্থে পশুর হাটে থাকবে কড়া নজরদারিও। হাটে স্বাস্থ্যবিধিও থাকবে বলে জানা গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে বৃহস্পতিবার মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়েছে, এ বছর সারাদেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু রয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ। গত বছরের চেয়ে এক লাখ পশু বেশি প্রস্তুত রয়েছে। গত বছর সারাদেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু ছিল প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ। আর এ বছর প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০টি গবাদিপশু কোরবানির জন্য মজুদ রয়েছে। যার মধ্যে হৃষ্টপুষ্টকৃত গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার এবং ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭৩ লাখ ৫৫ হাজার ও অন্যান্য ৪ হাজার ৫০০টি। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর মনে করছে কোরবানি হতে পারে সর্বোচ্চ ১ কোটি ১০ লাখের মতো। তবে প্রস্তুত রয়েছে আরও অনেক বেশি পশু। ২০১৮ সারে ১ কোটি ১৫ লাখ পশু প্রস্তুত ছিল এবং কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৫ লাখের মতো। বেশি পরিমাণে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত থাকায় দেশীয় পশুতেই কোরাবানি সম্ভব বলে মনে করছে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, এ বছরও দেশে কোরবানির জন্য গবাদিপশুর পর্যাপ্ত জোগান রয়েছে। কোরবানির জন্য কোন অবস্থাতেই বিদেশ থেকে গবাদিপশু আনার অনুমতি দেয়া হবে না। করোনার কারণে গবাদিপশু বিপণনে এ বছর আমরা অনলাইন বাজারের ওপর জোর দেয়ার চেষ্টা করছি। কোরবানির পশুর হাটে সুস্থ-সবল গবাদিপশু সরবরাহ ও বিক্রয় নিশ্চিতকরণ নিয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম আরও বলেন, আসন্ন ঈদ-উল-আজহায় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পর্যাপ্ত গবাদিপশু সরবরাহ ও বিপণনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোরবানি করে পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোরবানির পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকতে হবে, সচেতন হতে হবে, নিজের দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা দিয়ে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও সরবরাহে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। সভায় সভাপতির বক্তব্যে মন্ত্রী আরও বলেন, আমাদের প্রতিবছর কিছু খারাপ অভিজ্ঞতা হয়। কোরবানির পশু পরিবহনে রাস্তায় চাঁদাবাজি হয়, দীর্ঘসময় প্রাণীকে ট্রাকে আটকে রাখতে হয়। এবার আমরা চাই কোনরকম চাঁদাবাজি হবে না। যে অঞ্চলে সুযোগ আছে সেখান থেকে ট্রেনে পরিবহন হবে। খামারিদের খামারে পশু বিক্রয় হলে সেখান থেকে ইজারাদার টোল আদায় করতে পারবে না। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী জানান, গবাদিপশু বিপণন ও পরিবহন সমস্যা সমাধানে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে হটলাইন স্থাপন করা হবে। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তারা সর্বক্ষণিক হটলাইনে সম্পৃক্ত হবেন। গবাদিপশুর বাজারগুলোতে প্রায় ১২০০ মেডিক্যাল টিম কাজ করবে, যাতে রুগ্ন গবাদিপশু বাজারে না আসতে পারে। একইসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে মনিটরিং টিম গঠন করা হবে। কোরবানির হাটে স্বাস্থ্যবিধি প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, দফতর সংস্থার প্রতিনিধি এবং প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তা ও খামারিরা সভায় অংশগ্রহণ করেন।
এদিকে, শিক্ষিত তরুণরা এই সেক্টরে যুক্ত হওয়ায় দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট, উন্নতিও হচ্ছে প্রাণিজ সেক্টরে। গত কয়েক বছরে দেশীয় পশু লালন-পালন করে অনেক বেকার তরুণদের জীবনের গল্প পাল্টে গেছে। ছোট খামার থেকে কেউ গড়েছে বড় খামারও। যেই তরুণরা শিক্ষা জীবন শেষে চাকরির পেছনে ছুটতে তারাই কেউ কেউ এখন চাকরি দিচ্ছে নিজের গড়া ফার্মে। আর সেইসঙ্গে পশু সম্পদে সমৃদ্ধ হয়েছে দেশ। ২০১৫ সালের পর থেকেই দেশে পশু সম্পদ সেক্টরে পরিবর্তন দৃশ্যমান। বাড়তে থাকে খামারিদের সংখ্যাও। খামারিদের পাশাপাশি পশুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে কমে এসেছে ভারতীয় বৈধ পথে গরু আনার সংখ্যাও। গাজীপুরের খামারি মোহাম্মদ রাশেদুল একসময় চাকরির পেছনে ছুটে না পেয়ে অল্প পুঁজিতে গড়ে তুলেন গরুর খামার। সেই খামার বড় করার পাশাপাশি এখন শ্রমিক রেখেছেন। তিনি বলেন, একসময় স্বপ্ন ছিল চাকরিজীবী হব এখন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার ইচ্ছায় কাজ করি। জানা গেছে, দেশের নানাপ্রান্তে গড়ে উঠেছে গরু ছাগলের খামার। গত কয়েক বছর ধরে এই খামার গড়ে ওঠার প্রবণতা আরও বেড়েছে। এত খামার গড়ে ওঠার কারণ হিসেবে জানা গেছে, সচ্ছলতা এবং সাবলম্বী হচ্ছেন অনেক বেকার যুবক। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে মোটাদাগে টাকা হাতে আসাও একটি কারণ।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের খামার শাখার কর্মকর্তা ড. এবিএম খালেদুজ্জামান বলেন, দেশের খামারিরাই কয়েক বছর ধরে কোরবানির চাহিদা মেটাচ্ছে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। খামারি বাড়ছে, পশু উৎপাদন বাড়ছে, আমাদের প্রাণিজ সম্পদে সমৃদ্ধিও হচ্ছে। এ বছর সব মিলিয়ে খামারির সংখ্যা ৬ লাখের ওপরে। গত এক বছরে প্রায় ত্রিশ হাজার খামারি বেড়েছে। গতবার ছিল পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার ৪১৬ জন। ২০১৮ সালে খামার ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৯১টি। বছর বছর খামারির সংখ্যা যে বাড়ছে তার বড় একটা অংশ তরুণ। খামারি সালাউদ্দিন এবার খামারে ১৮টি গরু লালন-পালন করেছেন। তিনি বলেন, সন্তানের মতোই পশু লালন-পালন করতে হয়। খরচও বেড়েছে। এবার করোনায় কি হবে বুঝা যাচ্ছে না, আশা আছে লাভের। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এই বছর করোনাকালীন অনেকেই কাজ হারিয়ে বাসায় কৃষি, মৎস্য ও পশু পালনে আবার সম্পৃক্ত হচ্ছেন।
কমেন্ট বক্স