সমীকরণ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মূল লক্ষ্য সারা বিশ্বের সব মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা করা। এটি গঠনের আইনে ২৩টি দায়িত্বের কথা বলা আছে, কিন্তু কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ছয় বছরে স্মরণিকা ও নিউজলেটার প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এটির দৃশ্যমান কর্মকা-। বাংলাদেশের ‘নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ নামক একমাত্র বড় কাজের শুধু সমীক্ষার অংশটি শেষ হয়েছে। তা ছাড়া বিদেশে বাংলা ভাষার প্রসারে ইনস্টিটিউটের উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভে¤॥^র ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এ লক্ষ্যে সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির উত্তর পাশে প্রায় এক একর জায়গা বরাদ্দ করা হয়। ১২ তলার বিশাল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালের ৬ মে। তবে জোট সরকারের সময় এই ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১০ সালে। ভবনের ছয় তলা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। এরই মধ্যে ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়৷ ইনস্টিটিউট এখন ৪১ জন গবেষক ও কর্মকর্তা নিয়ে কাজ চালাচ্ছে। ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী বলেন, কাজ চালানোর মতো জনবল আছে বটে, তবে গবেষণাভিত্তিক বিপুল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দক্ষ ও বিশেষায়িত জনবলের অভাব আছে। নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র বড় আকারের কাজ নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা। বাংলাদেশের ভেতরে চালু বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অবস্থা জানার জন্য ২০১৩ সালে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয় সমীক্ষার কাজ। ২০১৬ সালের জুন মাসে সমীক্ষার মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ হয়। এখন চলছে সম্পাদনার কাজ। গবেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে ১০ খ- বাংলা ও ১০ খ- ইংরেজিতে বই আকারে প্রকাশ হতে আরও বেশ সময় লেগে যাবে। নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার পরামর্শক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভাষা নিয়ে একটা আউটলাইন তৈরি করতে পেরেছি। তবে ভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করতে যে প্রশিক্ষণ, সময়, অর্থ ও জনবল লাগে, সেগুলো কম ছিল। তবে বাংলাদেশে কতটা ভাষাগোষ্ঠী আছে, এই সমীক্ষায় তার মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেছে।’। দৃশ্যমান শুধু স্মরণিকা আর নিউজলেটার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন অনুযায়ী, এটির ২৩টি দায়িত্ব আছে। সেগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষা প্রচার-প্রসার, দেশ-বিদেশের ক্ষুদ্র জাতিসমূহের ভাষা নিয়ে গবেষণা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস সংরক্ষণ, অক্ষরবিন্যাস ও মুদ্রণের ব্যবস্থা করা মূল দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইনস্টিটিউট, বিশ্বের ১০টি শীর্ষস্থানীয় ভাষা শেখা ও ১০টি বিপন্ন ভাষার সংরক্ষণবিষয়ক একটি প্রকল্প প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন ও স্মরণিকা প্রকাশ করা। গত ছয় বছরে এখান থেকে বই বের হয়েছে তিনটি, স্মরণিকা নয়টি, বাংলা নিউজলেটার চারটি, ইংরেজি নিউজলেটার দুটি, একটি ষাণ্মাষিক এবং মাতৃভাষা নামের পত্রিকার দুটি সংখ্যা বেরিয়েছে। তা ছাড়া বের হয়েছে অনুবাদ বই লিথুয়ানিয়ার ইতিহাস। ইনস্টিটিউট সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। দেশের উপভাষা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ নিয়ে খুলনা ও রংপুরে দুটি কর্মশালা করেছে। ভাষা বিষয়ে সেমিনার করেছে দুটি। এ ছাড়া ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় তলায় ভাষা জাদুঘর। ৬৭টি দেশের মাতৃভাষাসহ নৃগোষ্ঠীর লিপি, লিখনব্যবস্থার পরিচয়সহ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে। ইউনেসকোর স্বীকৃতি দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষাবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ, ‘মাতৃভাষা আশ্রয়ী শিক্ষা’ ও ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য শিক্ষা’ কার্যক্রমে ইনস্টিটিউটের কাজের পরিকল্পনা আছে। এ কারণে এ ইনস্টিটিউট ২০১৫ সালের নভে¤॥^রে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা, ইউনেসকোর ক্যাটাগরি-২ ইনস্টিটিউটের স্বীকৃতি পেয়েছে। এই স্বীকৃতির পর জাতীয় ও ইউনেসকোর সদস্যদের সমন্বয়ে পুনর্গঠিত পরিচালনা বোর্ড দ্বারা এই ইনস্টিটিউট পরিচালিত হবে। অধ্যাপক সৌরভ সিকদার বলেন, একে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারলে ভাষা গবেষণায় স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।
সমীকরণ প্রতিবেদন