চুয়াডাঙ্গা-দর্শনা ১৮কি.মি. সড়ক এখন মরণফাঁদ ; ৭ স্থানে বিপদজনক বাঁক গত এক বছরে দুর্ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু ; আহত শতাধিক : কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি
- আপলোড তারিখঃ
১১-০২-২০১৭
ইং
নুরুল আলম বাকু: বিভিন্নস্থানে বিপদজনক বাঁক, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বোঝাই গাড়ীর বেপরোয়া চলাচল, সড়কের বিভিন্নস্থানে সতর্কীকরণ ট্রাফিক সিগনাল না থাকা ও সেই সাথে হাজার হাজার অবৈধযানের অবাধ চলাচলের কারনে চুয়াডাঙ্গা-দর্শনা ভায়া দামুড়হুদা সড়কপথে মৃত্যুর মিছিলে লাশের সংখ্যা বাড়ছেই। গত এক বছরেই এ রুটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে নারী, শিশু, পুলিশ ও কারারক্ষীসহ অন্তত ১৭জন। আহত হয়েছে শতাধিক। ক্ষতিসাধন হয়েছে যানবাহনসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদের। জানা গেছে, নানা অনিয়ম, অব্যাবস্থাপনা ও সংশিষ্টদের অবহেলার কারনে চুয়াডাঙ্গা জেলার চুয়াডাঙ্গা-দর্শনা ভায়া দামুড়হুদা ১৮কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি এখন মরণফাঁদে পরিনত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিপদজনক বাঁক, সড়কের পাশে হাটবাজার, সতর্কীকরণ ট্রাফিক সিগনাল না থাকা, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বোঝাই করে অদক্ষ চালকের বেপরোয়া গাড়ী চালনা, মাদকাসক্ত মোটরসাইকেল চালক, অদক্ষ, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ চালক দ্বারা চালিত হাজার হাজার অবৈধযানের অবাধ চলাচলই এ সড়কে দুর্ঘটনার মুল কারন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ সড়কে চলাচল করতে গিয়ে গত এক বছরে সড়কের বিপদজনক বাঁকসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নারী, শিশু, পুলিশ ও কারারক্ষীসহ অন্তত: ১৫জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে শতাধিক মানুষ। সেই সাথে ক্ষতিসাধন হয়েছে বেশ কয়েকটি যানবাহনসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদের। সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৯জানুয়ারি জয়রামপুর চায়ের দোকান মোড়ে দুইটি যাত্রীবাহী কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঊভয় গাড়ির চালক, হেলপার ও যাত্রীসহ মোট ৪জনের মৃত্যু হয়। সময় নারী ও শিশুসহ আহত হয় ১১জন। ২মার্চ লোকনাথপুর পাগলাদহ বাঁকে ট্রাকের চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। ১৭জুন দর্শনার মা ও শিশু হাসপাতালের বাঁকে তেলবাহী ট্যাঙ্কলরি সাইড দিতে গিয়ে যাত্রীবাহি বাস উল্টে খাদে পড়ে ২০যাত্রী আহত হয়। ৩ অক্টোবর কোষাঘাটা বাঁকে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নুরুজ্জামান(৩০) নামের এক কারারক্ষীর মৃত্যু হয়। ১০নভেম্বর কোষাঘাটা বাঁকে মাইক্রোবাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী জিএম সাইদুর (৩৮) নামের এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২৩ ডিসেম্বর জয়রামপুর শেখপাড়া বাঁকে পাথর বোঝাই ১০চাকার একটি ট্রাক ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ একই পরিবারের ৩ জনসহ মোট ৪জন নিহত হয়। এসময় আহত হয় আরোও ৬জন। এছাড়াও পুলিশ লাইনের সামনে, লোকনাথপুর পেট্রল পাম্পের সামনে, জয়রামপুর কাঁঠালতলা ও দর্শনা ফায়ার সার্ভিসের সামনে সংঘটিত দুর্ঘটনায় ট্রাক্টর, আলমসাধু ও করিমনের ধাক্কায় এক শিশুসহ মোট ৪জনের মুত্যু হয়েছে। সেই সাথে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের যানবাহনের ক্ষতিসাধনের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এসব যানবাহনের মালিকরা। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এ সড়কে জেলখানার সামনে, কোষাঘাটা মাদরাসার সামনে, পুড়াপাড়া, জয়রামপুর শেখ পাড়া ও চায়ের দোকান, লোকনাথপুর পাগলাদহ থেকে ফায়ার সার্ভিসের মাঝে, দর্শনার হঠাৎপাড়া থেকে মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে পর্যন্ত মোট ৭টি বিপদজনক বাঁক রয়েছে। রাস্তার পাশে বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বেশ কিছু অবৈধ দোকানপাট, লোকনাথপুর থেকে দর্শনা পর্যন্ত রাস্তার পাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠা বাড়িঘর, দামুড়হুদা সদরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন কাঁচাবাজার, ডুগডুগি পশুহাট ও কাঁচাবাজার, জয়রামপুরের কাঠাল তলায় রাস্তার পাশে কাঠের গুড়ির স্তুপ দেখা গেছে। সেইসাথে বিভিন্ন স্থানের বাঁকগুলির রাস্তার দু’পাশে ঝোপ-জঙ্গলসহ অবৈধ বাড়িঘর। কোন দিক থেকে যানবাহন আসলে এসবের আড়ালে থাকায় সহজে দেখা যায় না। সড়কের বেশিরভাগ স্থানে কোন ধরনের সতর্কীকরণ ট্রাফিক সিগনাল যেমন, সামনে বাজার, পুল, বিদ্যালয়, রাস্তার বাঁক, ক্রসিং রোডসহ কোথাও মানুষজনের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং, স্পিড ব্রেকার বা বাঁকে হলুদ-লাল রঙের ডোরাকাটা খুঁটির কোন অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। কোন সময় এসমস্ত স্থাপন করা হয়ে থাকলেও সড়ক বিভাগের নজরদারির অভাবে এসবের বেশিরভাগই চুরি বা নষ্ট হয়ে বর্তমানে তার উপস্থিতি চোখে পড়ে না। রাস্তার সাথে বেশ কিছু ইটভাটার অবস্থানের কারনে সারা বছরই এ সড়ক দিয়ে ইট, কাঠ, মাটি, বালি বোঝাই ট্রাক্টর, পাওয়ারট্রলি, লাটাহাম্বার যাতায়াত করে। এ সড়কের ধারে প্রতি সোমবারে ডুগডুগি ও বৃহস্পতিবারে শিয়ালমারি পশুহাট বসে। এ সমস্ত হাটের দিন ছাড়াও প্রায় সপ্তাহ জুড়েই গবাদিপশু বোঝাই শত শত ট্রাক ও পাওয়ারট্রলি, লাটাহাম্বার, আলমসাধু নামক অবৈধ যানবাহন চলচল করে। রাতদিন বাস-ট্রাকের সাথে পাল্লা দিয়ে সমস্ত সড়ক জুড়ে যাত্রী ও মালামাল নিয়ে চলাচল করে শত শত নসিমন, করিমন, লাটাহাম্বার, পাখিভ্যান নামক অবৈধযান। বিভিন্ন স্থানে সড়কের উপর চলে ধান, ভূট্টাসহ বিভিন্ন জিনিষ শুকানোর কাজ।
এসড়কে নিমিত চলাচলাকারী ট্রাকচালক কামাল, নুরুল, বাসচালক মমিনুল, কাশেম বলেন, এ সড়কে নসিমন, করিমন, আলমসাধূু ও লাটাহাম্বারের জন্য গাড়ী চালাতে খুবই অসুবিধা হয়। তারা অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বোঝাই করে দ্রুত গতিতে বেপরোয়াভাবে চলাচল করে। সাইড দিতে চায় না। মনে হয় এই বুঝি ধাক্কা মারলো। তাই খুব সাবধানে চলতে গিয়ে সময় নাষ্ট হয়। ইজিবাইক চালক ফারুক, হাসেম জানান, এ সড়কে ১০চাকার ট্রাকগুলো ওভার ও হাইলোড মালামাল লোড করে চলাচল করে। রাস্তাার পাশের গাছের ডালে বেধে যাওয়ার ভয়ে সড়কের মাঝ বরাবর চলে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে সড়কের পাশের মাটি মরে গিয়ে কাটানের সৃষ্টি হওয়ায় সহজে অন্যান্য গাড়ি সাইড দিতে চায় না। ফলে ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক বা ক্রস করতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনায় গড়ে।
এ ছাড়াও এ সড়কের চুয়াডাঙ্গা-দর্শনা রেলরুটের দর্শনা হঠাৎ পাড়া নামক স্থানে লেভেল ত্রসিংয়ে কোন গেট বা গেটম্যান না থাকায় প্রায়ই ঘটে দূর্ঘটনা। কয়েক বছর আগে চলন্ত ট্রেনের সাথে একটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই বাসের ৪জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। অপর একটি সুত্র জানিয়েছে, অদক্ষ, অশিক্ষিত, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ চালক দ্বারা ব্রেক, লাইট, হর্ন, ফিটনেসবিহীন অবৈধযান চালনা ও সেইসাথে সম্প্রতি একই মোটরসাইকেলে ২-৩জন করে মাদকাসক্ত যুবকদের দ্রুতগতিতে সড়কে বেপরোয়া চলাচলের কারনে দুর্ঘটনার আশংকা বেড়েছে বহুগুণ। সড়ক বিভাগসহ প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় সড়কপথে দিনের পর দিন নানা অনিয়ম বেড়েই চলেছে। ফলে সড়ক দিয়ে যানবাহন ও মানুষজনের চলাচল ক্রমান্বয়েই হয়ে উঠেছে মারত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে সচেতন মহলের দাবি, অনতিবিলম্বে এলাকার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক থেকে অবৈধ যানবাহন প্রত্যাহার, এলাকার ভাঙ্গাচোরা রাস্তাঘাট মেরামত ও সংস্কারসহ সমস্ত অনিয়ম দুর করে সড়কপথে নির্বিঘেœ যানবাহন চলাচল ও জনসাধরনের নিরাপদে পথচলা নিশ্চিত করা হোক।
কমেন্ট বক্স