ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কুমার নদপাড়ের ওমেদপুর ইউনিয়নের সীমানা ঘেঁষা বারইপাড়া (মধ্যপাড়া) গ্রাম। এ গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মো. ইসমাইল হোসেন ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় ছেলে লিটু। সারা দেশের মানুষ তাকে চেনেন মো. আসাদুজ্জামান নামে। তিনি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। এর আগে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের ৩১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন আসাদুজ্জামান। তার স্ত্রী শিরিন সুলতানা পেশায় শিক্ষক। দুই মেয়ে অঞ্জলি জামান (কথা) ও অধরা জামান শিক্ষার্থী। স্বাধীনতার পর ঝিনাইদহ জনপদের প্রথম পূর্ণমন্ত্রী তিনি। এর আগে পাকিস্তান আমলে প্রতিমন্ত্রী (ওয়াটার্স মিনিস্ট্রি) ছিলেন বশির মজুমদার। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শৈলকুপার মরহুম এমপি আব্দুল হাই স্বল্প সময়ের জন্য প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন।
আসাদুজ্জামানের পড়াশোনার হাতেখড়ি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্থানীয় গাড়াগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং শৈলকুপা সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এলএলএম সম্পন্ন করেন। আইন পেশায় যোগ দিয়ে মেধা ও দক্ষতার কারণে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান মরহুম ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহম্মেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটে যোগ দেন এবং বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠানের একজন অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্কুল জীবনেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন আসাদুজ্জামান। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)-এ যোগ দিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে পদার্পণ করেন। কলেজ জীবনে শৈলকুপা সরকারি ডিগ্রি কলেজ কমিটির সদস্য হন। ১৯৮৯ সালে কলেজ জীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিমউদ্দীন হল শাখা এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হন (জাসদ ছাত্রলীগ)। পরে কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদ লাভ করেন।
২০০১ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হন। তাকে অনুপ্রাণিত করেন শৈলকুপার প্রয়াত খন্দকার শহীদুল ইসলাম (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব)। স্থানীয়ভাবে নানা বাধা-বিপত্তি ও দলীয় বিভক্তির মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। তৎকালীন জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মরহুম মসিউর রহমান, ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল ওহাবসহ অনেকে তার বিরোধিতা করলেও ধৈর্য ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পরবর্তীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক পদ লাভ করেন। জি-৮ জিয়া গবেষণা পরিষদের সদস্যও হন। ১/১১-পরবর্তী সময় এবং ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নানা মামলা ও রাজনৈতিক চাপে দলীয় নেতাদের পাশে থেকে আইনি লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পান। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি কার্যকরভাবে প্রচারণা চালাতে পারেননি। সে সময় তার গ্রামের বাড়ি বারইপাড়ায় হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন উপদলের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে কাজ করেন তিনি। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শান্তি ও উন্নয়নের অঙ্গীকার তুলে ধরে জনমত তৈরি করেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন তিনি। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে আসাদুজ্জামান পান ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী পান ৫৭ হাজার ৫৫ ভোট। অপর দুই প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শৈলকুপায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি এবং ব্যক্তিগত সততা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণেই জনগণ তাকে সমর্থন দিয়েছেন।
ঝিনাইদহ অফিস