বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আলোচিত চরিত্র চুয়াডাঙ্গার লাল্টু অধ্যায়ের অবসান

বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থী নেতা, হয়ে ওঠেন ‘যমদূত’

  • আপলোড তারিখঃ ২৬-০২-২০২৬ ইং
বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থী নেতা, হয়ে ওঠেন ‘যমদূত’



নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের এক সময়ের পরিচিত মুখ ও ‘পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির’ নেতা নুরুজ্জামান লাল্টু (৭৭) আর নেই। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রামে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। পারিবারিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভোগার পর বুধবার সন্ধ্যায় টয়লেটে যাওয়ার সময় স্ট্রোক করে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে এলাকায় যেমন শোকের ছায়া নেমেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মনে উঁকি দিচ্ছে বিগত কয়েক দশকের রক্তঝরা সব স্মৃতি।


বিতর্কিত অতীত থাকলেও স্থানীয়রা তাকে একজন সমাজসেবক হিসেবেও স্মরণ করেন। আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা নাণ্টু স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা, গোকুলখালী বাজারে পশুহাট ও মাছের আড়ত চালু এবং এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে তার ভূমিকা ছিল অগ্রণী। তিনি আমৃত্যু চিৎলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় কয়রাডাঙ্গা নাণ্টু স্টেডিয়ামে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হবে। এরপর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে। তার মৃত্যুতে চুয়াডাঙ্গার রাজনীতির একটি রক্তাক্ত ও রহস্যময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে টয়লেটে যাওয়ার পথে হঠাৎ স্ট্রোকজনিত কারণে পড়ে গিয়ে কপালে আঘাত পান। পরিবার ও প্রতিবেশীরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি বাড়িতেই ইন্তেকাল করেন।


মরহুম নুরুজ্জামান নাণ্টু কয়রাডাঙ্গা গ্রামের মরহুম সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বিশ্বাসের ছেলে। ব্যক্তিজীবনে তিনি এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি চিৎলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মরহুমের ভাতিজা সাবেক চিৎলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বিপ্লব বলেন, ‘আমার চাচা মরহুম নুরুজ্জামান নাণ্টু, মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হবে। আগামীকাল (আজ) বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় কয়রাডাঙ্গা গ্রামে তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত নাণ্টু স্টেডিয়ামে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। পরে জানাজা নামাজ শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে।


তাঁর মৃত্যুতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক সংগঠন এবং সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় নেতৃবৃন্দ বলেন, নুরুজ্জামান নাণ্টুর মৃত্যুতে দেশ একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ও জনদরদি নেতাকে হারালো। তাঁর আদর্শ প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ মনে করবে। তাঁর ইন্তেকালে পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এক কিংবদন্তি ও বিভীষিকার নাম:
নুরুজ্জামান লাল্টু, যিনি এলাকায় ‘নাণ্টু’ নামেও পরিচিত ছিলেন, তার জীবন ছিল চরম নাটকীয়তায় ঘেরা। চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ওরফে ‘সিরাজ ডাকাত’-এর দ্বিতীয় সন্তান লাল্টু নিজেও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তবে স্বাধীনতার পর তার পথ বেঁকে যায় ভিন্ন দিকে। ১৯৭৩ সালে চুয়াডাঙ্গা কারাগার ভেঙে ১৫২ জন কয়েদিকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার দুঃসাহসিক ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি ও তার বড় ভাই মতিয়ার রহমান মণ্টু। সেই থেকে শুরু হয় তার সশস্ত্র জীবনের পথচলা। লাল্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় ছিল দীর্ঘ। এক সময় তাকে চুয়াডাঙ্গার ‘যমদূত’ বলা হতো। শত্রু নিধন করে আলামত নিশ্চিহ্ন করতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অভিযোগ রয়েছে, বহু মানুষকে জীবন্ত অবস্থায় হাত-পা বেঁধে ইটের ভাটায় পুড়িয়ে মারতেন তিনি। তার এই পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে ছায়াসঙ্গী হিসেবে নাম আসত তার ভাতিজা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বিপ্লবের।

রাজনীতির চোরাবালি ও ‘বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’:
লাল্টুর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত জটিল। জাসদ থেকে শুরু করে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল), এবং সবশেষে নিজেই গঠন করেন ‘বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’। নব্বইয়ের দশকে কুষ্টিয়ার মুক্তিযোদ্ধা মারফত আলী হত্যার প্রতিশোধ নিতে তিনি চরমপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তবে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আদর্শিক পার্থক্যের জেরে ১৯৯৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমান এবং সেখানে বিএসএফের অস্ত্র ছিনতাইয়ের অভিযোগে জেলেও খাটেন। ১৯৯৭ সালে দেশে ফিরে তিনি অত্যন্ত দ্রুত নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। ১৯৯৮ সালের ১ ডিসেম্বর ‘বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’ গঠনের মাধ্যমে তিনি চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের বিশাল এলাকায় নিজস্ব শাসন কায়েম করেন। তার বাহিনীর সাথে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ও সিরাজ বাহিনীর ত্রিমুখী সংঘাত ওই অঞ্চলকে লাশের জনপদে পরিণত করেছিল।

আত্মসমর্পণ ও বিচারিক জীবন:
১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই তৎকালীন সরকারের চাপে এবং জনমতের প্রতিক্রিয়ায় লাল্টু খুলনার ডিআইজি লুৎফুল কবিরের কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন। সেই সময় তার বিরুদ্ধে ২১টি হত্যাসহ অন্তত ২৬টি মামলা ছিল। পরবর্তীতে জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচ নেতা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার নাম উঠে আসে এবং ওই মামলায় তিনি অন্যতম আসামি ছিলেন। দীর্ঘ ১৯ বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। সাজাপ্রাপ্ত তিনটি মামলায় মোট ৭০ বছরের সাজা থাকলেও জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি নিজ গ্রামেই কাটিয়েছেন।



কমেন্ট বক্স
notebook

বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থী নেতা, হয়ে ওঠেন ‘যমদূত’