আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহের বিভিন্ন সড়ক এখন সজিনার ফুলের শুভ্রতায় মোড়া। শীতের শেষ আর বসন্তের শুরুতে সাদা-হালকা হলুদ ফুলে ভরে উঠেছে গ্রাম থেকে শহরের পথঘাট, বাড়ির আঙিনা ও ক্ষেতের আইল। এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে ঝিনাইদহের কৃষিতে নীরব এক বিপ্লব—সজিনার বাণিজ্যিক চাষ।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, জেলার প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে সজিনা (সজনে) আবাদ। কম খরচে বেশি লাভ, প্রতিকূল জমিতেও ভালো ফলন এবং বাজারে স্থায়ী চাহিদার কারণে কৃষকদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে একটি নির্ভরযোগ্য অর্থকরী ফসল। একসময় যেখানে অনাবাদি ও পতিত জমি পড়ে থাকত, সেখানে এখন সারি সারি সজিনা গাছ। জেলার গ্রামগুলো ঘুরলেই চোখে পড়ে রাস্তার ধারে, বাড়ির সীমানায় কিংবা খালের পাড়ের জমিতে সজিনা গাছের সবুজ ছায়া। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সজিনা চাষে বাড়তি পরিচর্যার প্রয়োজন নেই। একবার ডাল রোপণ করলে পরের বছর থেকে ফলন পাওয়া যায়। সেচ, সার বা কীটনাশকের ব্যবহারও নেই।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিসার নুর-এ-নবী জানান, এখানকার জলবায়ু ও মাটি সজিনা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ফলে অনাবাদি জমিও এখন আয়মুখী হয়ে উঠছে। সজিনা চাষের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর লাভজনক দিক। উৎপাদন খরচ খুবই কম, অথচ বাজারে সজিনার ডাঁটা, ফুল ও পাতা—সবকিছুরই ভালো চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও দেশের বড় সবজি বাজারে নিয়মিত সরবরাহ হচ্ছে ঝিনাইদহের সজিনা।
সদর উপজেলার বংকিরা গ্রামের কৃষক বাবুল বিশ্বাস জানান, ধান বা অন্য ফসলে যেখানে খরচ বেশি আর ঝুঁকিও থাকে, সেখানে সজিনা প্রায় ঝামেলামুক্ত। অবহেলার মধ্যেও সজিনা ভালো হয়। সজিনার সম্ভাবনা শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়।
ঝিনাইদহ অঞ্চলে উৎপাদিত সজিনার পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষ করে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে এর চাহিদা বাড়ছে। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই গুঁড়া স্বাস্থ্যপণ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাড়ির আশপাশে কয়েকটি সজিনা গাছ লাগিয়েই বাড়তি আয় করছেন। কেউ কেউ তা বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নারীরাও এই চাষে যুক্ত হয়ে পারিবারিক অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে খুলনা অঞ্চলে সজিনা চাষ আরও বড় আকারে সম্প্রসারিত হতে পারে। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির সুযোগ বাড়লে এটি হতে পারে অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য। সাদা ফুলে ভরা সজিনা গাছ তাই শুধু চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য নয়; ঝিনাইদহের গ্রামবাংলায় এটি এখন জীবিকা, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার প্রতীক।
ঝিনাইদহ অফিস