পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ বাংলা মদ প্লাস্টিকের বোতলে বাজারজাতের উদ্যোগ নেয়। এ জন্য দ্রুত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্লাস্টিকের বোতল ক্রয় করা হয়। তবে অনুমোদন না থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর কেরুজ কর্তৃপক্ষকে বোতলজাতকরণ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের বোতল, কর্ক ও লেবেল ক্রয় করে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দর্শনা কেরুজ চিনিকলের ডিস্টিলারি বিভাগে বিলাতি মদসহ বাংলা মদ (সিএস) উৎপাদিত হয়ে আসছে। ১৯৩৮ সাল থেকে বাংলা মদ ড্রামে ভরে বিভিন্ন পণ্যাগারে সরবরাহ করা হলেও সম্প্রতি প্লাস্টিকের বোতলে ১০০০ এমএল ও ৫০০ এমএল করে বাজারজাতের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এ জন্য প্রায় ৪০ হাজার বোতল, কর্ক ও লেবেল কেনা হয়। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া অ্যালকোহল জাতীয় পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা সম্ভব নয়। এই নিয়ম উপেক্ষা করেই বোতলজাতকরণের উদ্যোগ নেয় কেরুজ কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি জানার পর পরিবেশ অধিদপ্তর কঠোর অবস্থান নেয় এবং বোতলজাতকরণের অনুমোদন বাতিলের সুপারিশ করে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ড. মোহাম্মাদ শহীদ হোসেন চৌধুরী স্বাক্ষরিত গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর চিঠিতে (স্মারক নম্বর: ২২.০০.০০০০.০৭৩.০৪.০০৮.২১.৭১) কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাব্বিক হাসানকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া বোতলজাতকরণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০১৮ সালের ‘অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার’ ৩০(৫) ধারা অনুযায়ী, দেশি মদ পণ্যাগারে পৌঁছানোর পর তা পানের উপযোগী করতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ‘গেজিং’ ও ‘প্লাম্বিং’ করা বাধ্যতামূলক, যা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করতে হয়। এছাড়া পরিবেশ মন্ত্রণালয় পরিবেশগত ক্ষতির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্লাস্টিক বোতল বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে বাংলামদ বোতলজাতকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, লাইসেন্স ও অনুমোদন ছাড়াই কেন বোতলসহ অন্যান্য মালামাল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? এ ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?
একটি সূত্র জানিয়েছে, কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি এই আইনি বাধ্যবাধকতা না জানতেন, তাহলে এটি তার অদূরদর্শিতা ও অজ্ঞতার প্রমাণ। অনুমোদন না পেয়েও বোতলজাতকরণে এত বড় বিনিয়োগ করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি বিপাকে পড়েছে।
কেরুজ অ্যান্ড কোম্পানিকে ব্রিটিশ আমলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ১ লিটার ও আধা লিটারের বোতলে দেশি মদ বাজারজাতের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলা মদের প্রধান ভোক্তা ডোম, মেথর, মুচি ও চা-শ্রমিকরা নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র থেকে খোলা মদ কিনে থাকেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোতলজাতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এসব সম্প্রদায়ের মতামতও যাচাই করা হয়নি। এখন ক্রয় করা ৪০ হাজার বোতল চিনিকলের পুরোনো গুদামে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এই ক্ষতির দায়ভার কে নেবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
কেরুজ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাব্বিক হাসানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির চিঠিটি আমি হেড অফিসে পাঠিয়েছি, দেখা যাক কী সিদ্ধান্ত হয়।’ এদিকে, কেরুজ কর্তৃপক্ষের এই অনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন