অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অনুতোষ কুমারের ভাগ্য বদলে যায়। হাতে পান আলাদ্বীনের চেরাগ। আশ্চর্য এই চেরাগ হাতে পেয়ে সহায় সম্পদে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকেন তিনি। ৫০ টাকার বৈদ্যুতিক বাল্ব ৭৫০ টাকা দেখিয়ে করেন ভাউচার জালিয়াতি। এভাবে সরকারি কলেজের ফান্ড তছরুপ করে নামে বেনামে অঢেল সম্পদের মালিক হন তিনি।
কোটচাঁদপুর সরকারি খন্দকার মোশাররফ হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে তিনি ভাড়া বাসায় থাকলেও এখন তার ঝিনাইদহ শহরের একাধিক ফ্ল্যাট ও চারতলা বাড়ির সন্ধান মিলেছে। অনুতোষের রাতারাতি এই ভাগ্য বদলের নেপথ্যে রয়েছে সরকারি কলেজ ফান্ডের টাকা তছরুপ। কোটচাঁদপুর কলেজ থেকে ঝিনাইদহ সরকারি নরুন্নেহার মহিলা কলেজে বদলি হয়ে এসেও তার দুর্নীতি থেমে নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অধ্যক্ষ অনুতোষের বিরুদ্ধে মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও ইসকন সদস্য হওয়ার কারণে তাকে ‘দুধে ধুয়া তুলশি পাতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেও এখনো তিনি দিব্যি চাকরি করে যাচ্ছেন। কোনো তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে।
কোটচাঁদপুরের সরকারি খন্দকার মোশাররফ হোসেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অনুতোষ কুমারের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ১৪টি খাতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি-বেসরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্রয় সংক্রান্ত অনিয়ম, ভুয়া ভাউচার তৈরি ও সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের দোসর হওয়ার কারণে তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন। বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
কোটচাঁদপুর উপজেলা কুশনা ইউনিয়নের অভিভাবক শামসুল আলম অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষ অুনতোষ কুমার ২০১৯ সালের মে মাসে সরকারি কেএমএইচ ডিগ্রি কলেজে যোগদান করে চার বছর ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি কলেজের বিজ্ঞান এবং গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার ক্রয় ও মেরামত, বইপত্র ও সাময়িকী, অফিস সরঞ্জমা, ব্যবহার্য দ্রব্যাদি, আপ্যায়ন ও মনোহরি দ্রব্যাদি কেনায় বিপুল পরিমাণ টাকা পকেটস্থ করেন। এছাড়া শিক্ষা উপকরণ ক্রয়, আসবাবপত্র ক্রয় ও মেরামত, ক্রীড়া-সামগ্রী ক্রয়, অনুষ্ঠান উদ্যাপন বিল ও ভ্রমণ ব্যয় বিলসহ ইন্টারনেট বিলের ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।
মাসুম আহম্মেদ নামে এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, করোনাকালীন (২০২১-২২ অর্থবছর) এবং করোনা পরবর্তী শিক্ষা সফর না করেই জোরপূর্বক বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে শিক্ষা সফরের টাকা উত্তোলন করে তা লোপাট করেন। কলেজের বিজ্ঞানাগারে এখন পর্যন্ত কোনো যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য নেই। অথচ এই খাতের পুরো টাকা মেরে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া লাইব্রেরির বই, চেয়ার টেবিল, স্টিলের আলমারি, সাইন্সল্যাব অ্যাপারেটাস, বৈদ্যুতিক বাল্ব, ফ্যানসহ সার্চ লাইট না কিনে সরকারি তহবিল সাবাড় করে দেন অধ্যক্ষ অনুতোষ কুমার।
শামসুল আলম আরও জানান, বাজারে একটি বৈদ্যুতিক বাল্বের দাম মাত্র ৫০ টাকা। কিন্তু সেই বৈদ্যুতিক বাল্বের দাম ভুয়া ভাউচার তৈরি করে প্রতি পিস বাল্বে দাম ৭৫০ টাকা দেখিয়েছেন। কথিত আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অডিটে দুর্নীতির বিষয়টি ধরা পড়লেও অডিট খরচের কথা বলে সেই অভিযোগটি ৭ লাখ টাকার উৎকোচের মাধ্যমে রফাদফা করেছিলেন অনুতোষ কুমার।
সরেজমিন কলেজটি পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, কলেজের সকল পরীক্ষা, ভর্তি, ম্যানেজমেন্ট ফি, ইনকোর্স পরীক্ষা ফি, ফরম ফিলাপের টাকা ফান্ড থেকে তুলে অধ্যক্ষ অনুতোষ আত্মসাৎ করেন। কলেজে রোভার স্কাউটসের কোনো কর্মকাণ্ড না থাকা সত্ত্বেও রোভার মুটের নাম করে ভুয়া বিল করেছেন। তিনটি নিম্নমানের কেরাম বোর্ড কেনা দেখিয়েছেন ৬০ হাজার টাকা। মুজিববর্ষে মাত্র দুটি গাছের চারা লাগিয়ে ৩০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন। প্রশাসনিক ভবন রং করা বাবদ সাড়ে তিন লাখ ও ফুল বাগান করার নামে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন। আর এই কাজটি করা হয়েছে প্রতিটি কাজে আহ্বায়ক কমিটি করে। পরবর্তীতে আহ্বায়ক কমিটির সদস্যদের চাপ দিয়ে ভুয়া বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করে নিয়েছেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে কলেজের লুটপাটের টাকায় ঝিনাইদহ শহরের চাকলাপাড়ায় প্লট ও শহরের মোদনমহন পাড়ায় বহুতল ভবনে আলিশান ফ্লাটসহ বহু সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন অধ্যক্ষ অনুতোষ। বর্তমানে তিনি ঝিনাইদহ শহরে সরকারি নুরুন্নাহার মহিলা কলেজে কর্মরত আছেন। সেখানেও তিনি লাগামহীন দুর্নীতি ও ফান্ড তছরুপে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ অনুতোষ কুমার জানান, এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। একটি মহল আমার বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছিলেন। অডিট টিম ৪ বছরের কেনাকাটার ভাউচার নিয়ে গেছেন। তারা কোনো দুর্নীতি পায়নি। তবে শহরে তার ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। এগুলো তিনি পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে কিনেছেন বলে অধ্যক্ষ অনুতোষ দাবি করেন।
সমীকরণ প্রতিবেদন