চুয়াডাঙ্গায় খলিল মালিক হাসপাতালের উদ্বোধন ও খলিল মালিক ফাউন্ডেশন ডায়ালাইসিস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আয়োজনে দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় সরকারি কলেজ সড়কের মুক্তমঞ্চে হাসপাতালের উদ্বোধন অনুষ্ঠান ও দিনব্যাপী স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা ‘ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প’ অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর দিনব্যাপী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা, প্রতিরোধ এবং সঠিক জীবনযাত্রার বিষয়ে রোগীদের পরামর্শ দেন।
ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আগে খলিল মালিক ফাউন্ডেশন ডায়ালাইসিস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চেয়ারম্যান ড. সাদিকুর রহমান মালিকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ড. সাদিকুর রহমান মালিকের এই মহতী উদ্যোগের জন্য আমি তাকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা জানেন, মানুষ লেখাপড়া করে উচ্চ শিক্ষার পর দেশের বাইরে চলে যায়। ফিরে আসে না। কিন্তু ড. সাদিকুর রহমান মালিককে দেখলাম যিনি পেছনের দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি তার সন্তানসহ পরবর্তী প্রজন্মকে এই জেলার মানুষের কাছে পরিচিত করে দিয়ে গেলেন। জেলার মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ করে দিয়েছেন। ওনার সন্তানরা দেশের বাইরে লেখাপড়া শেষে চাকরি করেন। অথচ তিনি তার সন্তানদের নিজ জেলার মানুষের কল্যাণে কাজ করার শিক্ষা দিয়েছেন।’
জেলা প্রশাসক জহিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘৮০ বছর বয়সে নিজ জেলার মানুষের জন্য ভালোবাসার টানে তিনি এত অফিস আদালত ঘুরে এই প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। তিনি শুধুমাত্র ভালোবাসার জায়গা থেকেই এই কাজটি করতে সফল হয়েছেন। তিনি এই জেলার মানুষের জন্য আমেরিকার ন্যায় উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। তিনি নিবেদিত প্রাণ, সুন্দর একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। আমি ড. সাদিকুর রহমান মালিকের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এবং আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করবো এর নিশ্চয়তা দিতে চাই। কারণ আমি মনে করি তারা এই জেলার মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি চিকিৎসা সেবার মানটা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনতে পারি তাহলে বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব। আমরা দেখলাম খলিল মালিক ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানে একটি আধুনিক মানের হাসপাতালের উদ্বোধন হওয়ায় এলাকার মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা পাবেন। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনেক সময় বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দেয়, যা রোগীদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। চিকিৎসকদের আন্তরিকতা এবং পেশাদারিত্বের মাধ্যমে এ সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব। পাশাপাশি রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অতীতে দেখেছি, কিছু প্রতিষ্ঠানের অবহেলা বা অসাধু কার্যকলাপের কারণে জনসাধারণ ক্ষুব্ধ হয়ে ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব এড়াতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হবে। খলিল মালিক ফাউন্ডেশনের এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী হিসেবে আমরা সবসময় এ ধরনের ইতিবাচক কাজকে সহযোগিতা করে যাব।’
সিঙ্গাপুরস্থ বাংলাদেশ বিজনেস অব চেম্বারের (বিডিচ্যাম) সভাপতি, সাহিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এনআরবি ওয়ার্ল্ডের প্রেসিডেন্ট সাহিদুজ্জামান টরিক বলেন, ‘৮০ বছর বয়সী ড. সাদিকুর রহমান যিনি তার জন্মভূমি চুয়াডাঙ্গার মানুষ নিয়ে চিন্তা করেন। চুয়াডাঙ্গার অনেক মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাদের কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছেন। কিন্তু সবাই নিজ দেশের মাটি, জেলোর মানুষের কথা মনে রাখেন না। কিন্তু এই বয়সে এসেও ড. সাদিকুর রহমান যে চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করেন, তার মনে নিজ জেলার জন্য ভালোবাসা রয়েছে, আমেরিকা থেকে নিজ পরিবার নিয়ে তাদের আজকের এই বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প আয়োজন ও উন্নত সেবার প্রয়াসে হাসপাতাল নির্মাণ তার প্রমাণ করছে। ওনার সন্তান আমেরিকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ওনার পরবর্তী প্রজন্মও যে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছে তা অনুপ্রেরণার। তিনি তার সন্তানদের নিজের দেশের জন্য কাজ করার শিক্ষা দিয়েছেন, আর যার সুবিধা এই জেলাবাসী নিশ্চয়ই পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এই চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে লেখাপড়া করেছি, যখন বাইরের কোনো দেশে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখি তখন মনে হয়, যদি এই প্রতিষ্ঠান আমাদের চুয়াডাঙ্গাতে থাকতো। এর একটিই কারণ আমি যেখানেই থাকি, চুয়াডাঙ্গা আমার মনের মধ্যে থাকে সব সময়। ড. সাদিকুর রহমান তার সন্তানদের যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, তার সন্তানদের জন্ম চুয়াডাঙ্গাতে না হলেও সেই শিক্ষার কারণেই তারা আজ দেশের মাটিতে, এই চুয়াডাঙ্গার মানুষের জন্য কাজ করতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন।’
সাহিদুজ্জামান টরিক বলেন, ‘যারা দেশের বাইরে সফলতা অর্জন করেছেন, তারা যদি তাদের সন্তানদের এই শিক্ষা দেন, ‘যদিও তুমি আকাশ ছুঁয়ে নাও, এরপরও নিজের দেশের মাটিকে ভুলো না। তাহলেই দেখবেন দেশের প্রতিটি কোনায় কোনায় আশার আলো জ্বলে উঠবে।’
অনুষ্ঠানে এছাড়াও বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গা সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল রশিদ এবং জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সিদ্দীকা সোহেলী রশিদ। স্বাগত বক্তব্য দেন খলিল মালিক ফাউন্ডেশন ডায়ালাইসিস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোষাধ্যক্ষ ফাওয়াজ মাহমুদ জোয়ার্দ্দার। এছাড়াও বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চুয়াডাঙ্গা শাখার আহ্বায়ক আসলাম হোসেন অর্ক।
সমাপনী বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সভাপতি চুয়াডাঙ্গা খলিল মালিক ফাউন্ডেশন ডায়ালাইসিস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চেয়ারম্যান ড. সাদিকুর রহমান মালিক বলেন, ‘আমি ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সাফল্যকে স্মরণ করি, এই সাফল্য ধরে রাখতে হবে।’ তিনি উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের মনে হয়তো একটি প্রশ্ন এসেছে, এই প্রতিষ্ঠান কেন? না করলেও তো হতো। এর উত্তর দিতে হলে বলতেই হয়, আমার মায়ের মৃত্যু হয়, ডায়রিয়া ও কলেরা আক্রান্ত হয়ে। বিনা চিকিৎসার মারা যান। এটি অনেক আগের কথা, পাশের গ্রামের একটি দাওয়াতে যাওয়ার জন্য আমি আমি বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলাম, মা আমাকে বললেন তুই যাস না, আমি হয়তো বাঁচবো না। আমি বলেছিলাম তোমার কিছু হবে না। কিন্তু এর এক ঘণ্টার মধ্যে আমি জানতে পারি আমার মা মারা গেলেন। এরপর থেকেই আমার মধ্যে স্বপ্নের সৃষ্টি হয়। দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। নিজ জন্মভূমির জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। আমার স্বপ্ন বাড়তে থাকতে। বগুড়া ক্যান্সার সেন্টার, ডেলটা হাসপাতাল ও খলিল মালিক হাসপাতাল আমি সুপ্রতিষ্ঠ করতে চেয়েছিলাম। আমি তা করেছি। আমার স্বপ্ন মেঘের ন্যায় বাড়তে থেকেছে, আমি জানি না আমি কতদূর তা সম্পন্ন করতে পারবো, আপনাদের সকলের সহযোগিতা পেলে আমি সেই স্বপ্নের পথে শেষ দিন পর্যন্ত চলতে চাই।’
দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা, প্রতিরোধ এবং সঠিক জীবনযাত্রার বিষয়ে রোগীদের পরামর্শ প্রদান করা হয়। মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন নেফ্রোলজিস্ট (ইউএসএ) ডা. ফাহিম মালিক, চাইল্ড স্পেশালিস্ট (ইউএসএ) ডা. সাহরিন মালিক এবং নেফ্রোলজিস্ট ডা. আফজালুর রশীদ। শতাধিক রোগী দিনব্যাপী চলা এ কর্মসূচির মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চুয়াডাঙ্গা পৌর ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক আয়েশা আক্তার রিক্তা।
সমীকরণ প্রতিবেদন