- একই পরিবারের চারজনকে নিয়োগ, বঞ্চিত স্থানীয়রা
- জ্বালানি খরচের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি
- সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত
- নিরাপত্তা প্রহরীকে প্রভাবশালী সহচরে রূপান্তর
- লোপাটের টাকায় সাতক্ষীরায় জমি কিনে করেছেন তিনতলা বাড়ি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্ব ফাঁকি দেয়াসহ নানা অভিযোগে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছেন এ কর্মকর্তা। তিনি সরকারি টাকা লোপাট করে সাতক্ষীরা জেলার নিজ এলাকায় জমি কিনে নির্মাণ করেছেন তিনতলা বাড়ি। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি লিখিত পত্রও পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিসংখ্যান অফিসের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন শরিফুল ইসলাম। এরপর থেকে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ক্রমাগত জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন অপকর্মে। কার্যালয়ের বেশকিছু কর্মচারীর আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজ ইচ্ছাবলে যা খুশি তাই করে চলেছেন। অর্থলোভের কারণে যোগদান করেই কার্যালয়ের তহবিল থেকে কৌশলে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এরপর দায়িত্বে ফাঁকি ও অনিয়ম তার রুটিনে পরিণত হয়। কার্যালয় পরিসংখ্যান সহকারী রিপনকে ব্যবহার করে দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে নিজ জেলা সাতক্ষীরায় ব্যক্তিগত কাজে সময় দেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, জেলা কার্যালয়ের বাৎসরিক মালামাল ক্রয়ের নামে হাতিয়েছেন বড় অঙ্কের অর্থ।
শ্রমশক্তি প্রকল্প, আর্থসামাজিক ও জনমিতিক শুমারী কাজে চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় যোগ্য বেকারদের বঞ্চিত করে মেহেরপুর জেলার একই পরিবারের মাহামুদা আক্তার, তার মেয়ে নাজিয়া ফারহা, বোন জামাই রক্তিম ও তার মেয়ে জামাই হিমেলসহ চারজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এতে অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হলেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। এসভিআরএস প্রকল্পে ৩৩ জন রেজিস্ট্রার নিয়োগেও স্বজনপ্রীতি ও নিয়মবহির্ভূত কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের পরিচালক ও মহাপরিচালকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করেছেন।
জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারে পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত করাসহ বিস্তর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে কাজ তদারকির জন্য প্রতি মাসে ১০০ লিটার জ্বালানি তেল বরাদ্দ থাকলেও গাড়ি না চালিয়েও তিনি ব্যয় দেখিয়ে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা তুলে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। দপ্তরের টাকা লোপাট করে সাতক্ষীরা জেলার নিজ এলাকায় জমি কিনে নির্মাণ করেছেন তিনতলা বাড়ি।
এদিকে, কার্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী নাজমুলকে আর্থিক সুবিধা এবং অনৈতিক সুযোগ দিয়ে নিজের প্রভাবশালী সহচরে পরিণত করেছেন। নিরাপত্তা প্রহরী নাজমুল পতিত স্বৈরাচার সরকারের অনুগত হওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে তার নাম তালিকাভুক্তও করেছিলেন ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, প্রহরী নাজমুল তার আত্মীয়-স্বজনদের আর্থসামাজিক ও জনমিতিক শুমারী প্রকল্পে নিয়োগ পাইয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। ওই প্রকল্পে জনপ্রতি ৪৬ হাজার টাকা করে সম্মানী দেয়া হয়েছিল। চলতি বছরে চলমান অর্থনৈতিক শুমারী প্রকল্প কাজে এসএসসি, ডিপ্লোমা পাস করা নিরাপত্তা প্রহরীকে অযোগ্যতার পরও আঞ্চলিক কার্যালয়ে নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গড়াইটুপি ও কুতুবপুর ইউনিয়নের আঞ্চলিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ওই নিরাপত্তা প্রহরী নাজমুল তার নিজের স্ত্রীসহ তার আপন শালিকা, ছোট শ্যালক, বড় শ্যালকের স্ত্রীকে গণনাকারী ও সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অজ্ঞাত কারণে জেলা পরিসংখ্যান ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম জিম্মি হয়ে পড়েছেন। নিরাপত্তা প্রহরী নাজমুলকে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ দিয়ে অনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। নিরাপত্তা প্রহরীও কার্যালয়ে যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করেন না। সর্বশেষ, সংবিধান সংস্কারে জনমত জরিপ প্রকল্পের কাজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। মাত্র ৬ দিনের কাজে ১৮ হাজার টাকা করে সম্মানী দেওয়া হয়েছে। জেলাব্যাপী কাজ করেছেন ১২ জন। তারা পেয়েছেন মোট ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। প্রশিক্ষণ ভাতা পেয়েছেন জনপ্রতি ১ হাজার ৯০০ টাকা গড়ে। এছাড়া, সবচেয়ে বড় খবর হলো- মাঠপর্যায়ে কর্মচারী নিয়োগে স্থানীয়দের বাদ দিয়ে নামে বেনামে মেয়েদের দিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহর এলাকা এড়িয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলায় কাজ করানো হয়েছে।
সরেজমিনে জেলা পরিসংখ্যান অফিসে গতকাল সোমবার গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের দেখার সাথে সাথে নিরাপত্তা প্রহরী নাজমুল অফিসে উপ-পরিচালকের রুমে প্রবেশ করেন। এবং উপ-পরিচালকের পাশে রাখা চেয়ারেই বসেন। গণমাধ্যমকর্মীরা প্রশ্ন করলে উপ-পরিচালক উত্তর না দিয়ে নিরাপত্তা প্রহরী নাজমুল উত্তর দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে গণমাধ্যমকর্মীরা নাজমুলকে বাইরে বসার অনুরোধ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে ওই অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেখে মনে হবে উনি ভাজা মাছটি উল্টিয়ে খেতে জানেন না। তবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অনিয়ম, অন্যায় করেই চলেছেন। তার বিরুদ্ধে কথা বলতেও দেন না।’ এসব বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো চুয়াডাঙ্গা জেলা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা কী বলছেন, আমি কিছু বুঝতেছি না। আমার অফিসে কোনো অনিয়ম হয়নি। সময় নিয়ে আসেন, আজ কাগজপত্র দেখানোর সময় নেই। পরে এসেন, দেখাবো।’
সমীকরণ প্রতিবেদন