আলমডাঙ্গায় জমি-জমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির ঘটনায় গড়িয়েছে। গতকাল রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার খাসকররা ইউনিয়নের রামদিয়া গ্রামের মাঝেরপাড়া এলাকায় আহমেদ শরীফ (৪৫) নামের এক কৃষককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যিনি স্থানীয়ভাবে ‘ছোট বুড়ো’ নামে পরিচিত এবং গ্রামের মৃত বিসারত আলীর ছেলে। এই ঘটনায় নিহতের পক্ষের আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন- একই গ্রামের পল্টু আহমেদ (৫০), ইদ্রিস আলীর ছেলে আব্দুল আলিম (৪০), সেলিম (৫৫) ও তার ছেলে সোয়েব (৩৩)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমি-জমা নিয়ে একই গ্রামের আনসার আলী ও ফরিদ জোয়ার্দ্দার পক্ষের লোকজনের সঙ্গে নিহত আহমেদ শরীফ ও তার পক্ষের পল্টু-হালিম গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। পল্টু-হালিম গ্রুপের সদস্যরা স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ৫ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত আনসার আলী ও ফরিদ জোয়ার্দ্দারদের ওপর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিল। তবে গত ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট থেকে পল্টু-হালিম গ্রুপ ও আনসার আলীদের মধ্যে কয়েক দফা হামলা, পাল্টা হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে ১১ আগস্ট আনসার আলীর ভাতিজা মাসেম আলীকে পল্টু-হালিম গ্রুপের লোকজন আহমেদ ওরফে ছোট বুড়োর নেতৃত্বে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রাখা ঘটনা ঘটায়। যার প্রেক্ষিতে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে আনসার আলীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনও করা হয়েছিল। এই ঘটনা দুই পক্ষের বিরোধকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলে।
স্থানীয়রা বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের পাশপাশি দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়েও বিরোধ চলে আসছিল। দুই পক্ষ ইতোপূর্বে কয়েক দফা হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটিয়েছে। এরই জেরে গতকাল দুই পক্ষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ালে গুরুতর জখম হয়ে আহমেদ শরীফ ওরফে ছোটো বুড়ের মৃত্যুর ঘটে।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র আরও জানিয়েছে, ইতোপূর্বে বারবার হামলার শিকার হয়ে পল্টু-হালিম গ্রুপের সদস্যরা একসময় গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। তবে গতকাল সন্ধ্যায় আহমেদ শরীফ ওরফে ছোট বুড়োসহ কয়েকজন মাঝেরপাড়া মসজিদের সামনে আনসার আলী গংয়ের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাদের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়। এসময় দুপক্ষই দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ছিল।
স্থানীয়রা বলেন, এ ঘটনায় আহমেদ শরীফের মৃত্যুসহ তার পক্ষের পল্টু-হালিম গ্রুপের আরও চারজন আহত হয়েছে। এছাড়াও আনসার আলী ও ফরিদ জোয়ার্দ্দার পক্ষেরও বেশ কয়েকজন জখম হয়েছে। ঘটনার পর তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান। তারা কোথায় চিকিৎসা নিয়েছে, এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, সংঘর্ষের পর স্থানীয়রাদের সহায়তায় নিহত আহমেদ শরীফের পরিবারের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়। হবে হরিণাকুণ্ডু হাসপতালে নেয়ার আগেই আহমেদ শরীফের মৃত্যু হয়।
নিহত আহমেদ শরীফের বেয়াই আওলাদ হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই আনসার আলী ও ফরিদ জোয়াদ্দার পক্ষের লোকজন ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। গত ৬ আগস্ট মাঠে কাজ করার সময় আনসার আলীর লোকজন হালিমকে মারধর করে। পরদিন পল্টুর বাড়িতেও হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এভাবে বারবার হামলার কারণে আমাদের লোকজন বাড়িছাড়া হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘এরই মধ্যে আজ (গতকাল রোববার) এশার নামাজের পর আহমেদ শরীফসহ কয়েকজনকে মাঝেরপাড়া পুরাতন মসজিদের সামনে পেয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় নৃশংসভাবে আহমেদ শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করেছে।’
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘থানাধীন রামদিয়া গ্রামে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একপক্ষের একজন নিহত এবং তিন-চারজন আহত হয়েছে। এছাড়াও প্রতিপক্ষেরও কয়েকজন আহত হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। ঘটনার খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করা হয়। নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন হয়েছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপতাল মর্গে প্রেরণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘হত্যা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ শুরু করেছি।’
সমীকরণ প্রতিবেদন