দেশের বৃহত্তম চিনিকল দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ২০২৪-২৫ আখ মাড়াই মৌসুম শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে চিনিকলের কেইন কেরিয়ারে আখ নিক্ষেপের মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মাড়াই কার্যক্রম শুরু করা হয়। এ উপলক্ষে বেলা তিনটায় এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। কেরু চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান (গ্রেড-১) ড. লিপিকা ভদ্র।
প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি বলেন দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৯টি চিনিকল চালু করতে পেরেছি। বাকি ৬টি মিল চালু করার অনুমোদন পেয়েছি। যা আগামী বছর চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে এসব মিল চালু করতে হলে বেশি বেশি আখ লাগানোর জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে এলাকার কৃষক ও শ্রমিকদের কাছে সকল প্রকার সহযোগিতা চাই। তিনি বলেন, ‘আমি শ্রমিকদের ২০১৫-১৬ সালের বেতন প্রদান করতে পেরেছি। বাকি ২০১৮ সালের বেতন-ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করেছি। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশন অনেক ঋণগ্রস্ত হয়ে আছে। এই ঋণ পরিশোধ করতে আমরা সকলে হাতে হাত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু চিনি শিল্প নয়, আমরা চেষ্টা করছি নতুন নতুন প্রজেক্ট তৈরি করার। যেমন কেরুতে জৈব্য সার কারখানা, যে এলাকায় পানি ভালো, সেখানে মিনারেল ওয়াটার কারখানা তৈরি করব। রাজশাহীতে প্রচুর আলু হয়, সেখানে চিপস খারখানা তৈরি করব। বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আপনাদের কাছে অনুরোধ, যে যেভাবে পারেন, পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবেন।’
ড. লিপিকা ভদ্র বলেন, প্রতি দুই বছর পর পর চাষীদের জন্য আখের মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এ বছর বন্ধ থাকা দেশের ৬টি চিনিকল কারখানা চালু করা হয়েছে। আখ চাষ বৃদ্ধি সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে সকল চিনিকল চালু করা হবে। আমরা দেশেই চিনি উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমাতে চাই। দেশের চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আমরা সিন্ডিকেট ভাঙতে চাই। মধ্যস্বত্ত্বভোগী কেউ যাতে লাভবান হতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল করিম, চুয়াডাঙ্গা জেলা সিনিয়র দায়রা জজ আকবর আলী, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের প্রধান রসায়নবিদ আনিসুল হক, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চুয়াডাঙ্গা জেলার আহ্বায়ক আসলাম হোসেন অর্ক, দর্শনার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক তন্ময় হাসান, কেরুজ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফিরোজ আহমেদ সবুজ, সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমানসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।
এছাড়া অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দর্শনা পৌর বিএনপি প্রধান সমন্বয়ক হাবিবুর রহমান বুলেট ও সমন্বয়ক সদস্য নাহরুল ইসলাম। এর আগে আলোচনা সভার শুরুতেই পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করেন কেরুজ জামে মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. শামসুজ্জামান।
অনুষ্ঠানের সভাপতি কেরু চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান স্বাগত বক্তব্যে বলেন, কৃষকরা হলো মিলের প্রাণ। তাই কৃষকদের বেশি বেশি আখ রোপন করতে হবে। চিনির মান বাড়াতে পরিস্কার আখ মিলে দিতে হবে। কোদাল দিয়ে আখ কাটতে হবে, তাহলে বেশি পরিমাণে আখ পাওয়া যাবে। এছাড়া কেরু কোম্পানির উৎপাদিত জৈব্য সার ব্যবহার করলে আখের ফলন বেশি পাওয়া যাবে বলে কৃষকদের আহ্বান জানান।
কেরু চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ আখ মাড়াই মৌসুমে ৬৫ কার্যদিবসে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা থেকে ৪২০০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হবে। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৫০ টন আখ মাড়াই করবে চিনিকলটি। এ মৌসুমে আখ থেকে চিনি আহরণের হার ধরা হয়েছে ৫ শতাংশ। এবছর এ অঞ্চলের ৬ হাজার একর জমির মাড়াইযোগ্য আখ সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে কেরু চিনিকলের নিজস্ব জমি থেকে ২৭ হাজার মেট্রিক টন আখ পাওয়া যাবে। বাকি ৪৩ হাজার মেট্রিক টন আখ মিলবে অন্যান্য সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে।
উল্লেখ্য, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি চিনি উৎপাদন করে আসছে। এ অঞ্চলের একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসাবে জেলাকে আলোকিত করে রেখেছে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। তবে চিনি ছাড়াও এই কারখানা থেকে মদ, ভিনেগার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জৈব সার, চিটাগুড়সহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। এ প্রতিষ্ঠানটি চিনি উৎপাদন কারখানা, ডিস্টিলারি, জৈব সার কারখানা ও বাণিজ্যিক খামারের সমন্বয়ে গঠিত বৃহৎ এ শিল্প।
সমীকরণ প্রতিবেদন