চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সরোজগঞ্জ বাজার। বাজারের মেইন সড়কের চার রাস্তার মোড় থেকে কিছুটা ভেতরে সরোজগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি গুড়ভর্তি মাটির ভাঁড়। ক্রেতা-বিক্রেতা এবং শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততায় জমজমাট পুরো এলাকা। শীতের শুরুতেই, প্রতিবছরের মতো এবারও জমে উঠতে শুরু করেছে দেশের বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ খেজুর গুড়ের হাট। প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও শুক্রবার দুদিন এই এই হাট পরিচালিত হয়। খেজুরগাছ থেকে সংগৃহীত রস দিয়ে তৈরি ঝোলা গুড় এবং নলেন পাটালির ঐতিহ্য হাটটি বহন করে চলেছে প্রায় দুইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
হাট সূত্রে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন প্রান্তের গাছিদের উৎপাদিত প্রায় দুই কোটি টাকার গুড় বেচাকেনা হয় প্রতি হাটে। মান ও ওজনভেদে এক ভাঁড় গুড়ের দাম ৯০০ থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত বা তারও বেশি দামে বিক্রি হয়। আর খুচরা হিসেবে প্রতিকেজি গুড় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পাটালি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি। এবারের মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকায় দামও কিছুটা বেড়েছে। স্থানীয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা এই হাট থেকে গুড় কিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।
এদিকে, সরোজগঞ্জের গুড়ের হাট স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। হাটের মাধ্যমে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। গাছি, শ্রমিক, এবং পরিবহন ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় দোকানপাটের বিক্রিও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। হাটে আগত ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য বিভিন্ন খাবারের দোকান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যবসাও জমে উঠে সপ্তাহের দুটি দিনের পাপাশি অন্য দিনগুলোতেও।

ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে গুড় কিনতে আসা ব্যাপারী শহীদ হাসান বলেন, ‘দেশের অন্যান্য হাটের চেয়ে সরোজগঞ্জের গুড়ের মান ভালো। অন্য হাটে সস্তা গুড়েও চিনি মেশানো থাকায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা তা কেনেন না। তবে সরোজগঞ্জের হাটে আসা বেশিরভাগ গুড়ই সম্পূর্ণ খাঁটি হওয়ায় এখানের গুড়ের চাহিদা দেশের সব জেলাতেই তৈরি হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় গুড়ের উৎপাদন কম হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এই গুড়ের হাটের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে খেজুর গাছ কাটা বন্ধ করতে এবং খেজুর গাছ রোপণে গুরুত্ব দিতে হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, কিছু কিছু অসাধু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা গুড়ে চিনির মিশ্রণ করেন। এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পারলে হাটের সুনাম অক্ষুণ্ন থাকবে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কালুপোল গ্রামের গাছি জহুরুল হক বলেন, ‘গত দুই দশক ধরে আমি এই হাটে গুড় বিক্রি করছি। তবে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমছে। ফলে দাম কিছুটা বাড়লেও তা আমাদের পরিরশ্রমের তুলনায় কম। গাছিরা খুব বেশি লাভবান না হতে পারলেও ব্যাপারীরা লাভবান হচ্ছেন।’
সরোজগঞ্জের এই গুড়ের হাট স্থানীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি সারা দেশের গুড় সরবরাহের একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। স্থানীয় গাছি ও ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, সঠিক উদ্যোগ নিলে খেজুরগাছ রোপণ ও গুড় উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
বর্তমানে অস্থায়ী সরোজগঞ্জ বাজার শাখা কমিটি ও জামায়াতে ইসলামীর বাজার কমিটির সভাপতি মামুন হাওলাদার এবং পূর্বের বাজার কমিটির সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর সহসাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক জানান, এ হাট থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গুড় সরবরাহ করা হয়। প্রতি হাটের দিন গড়ে ২৫০ টন খেজুর গুড় বিক্রি হয়। যার বিক্রয়মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। সরোজগঞ্জ হাটে বিক্রি হওয়া বেশির ভাগ গুড়ই এলাকার কৃষকেরা/গাছিরা বাড়িতে যত্নের সঙ্গে তৈরি করেন। এতে চিনি বা কোনো রাসায়নিক নেই। কিছুটা খয়েরি রঙের হলেও এসব গুড় পুরোটাই খাঁটি।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার খেজুরগাছ রয়েছে। এর অর্ধেকই সদর উপজেলায়। এ জেলা থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদিত হয়। তবে গাছিদের অভাব এবং নতুন করে গাছ রোপণ না করার ফলে খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে চাহিদা বাড়লেও তুলমামূলক উৎপাদন কম হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়ন সুপারভাইজার মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রতি মৌসুমে একটি খেজুর গাছ থেকে গড়ে ১০ কেজি গুড় পাওয়া যায়। জেলার গুড় বিক্রিতে সরোজগঞ্জ হাট দেশের অন্যতম প্রধান মোকাম। তিনি বলেন, ‘খেজুর গাছ রোপণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আমার গাছিদের এ বিষয়ে পরামর্শও দিচ্ছি। কিন্তু নানা কারণে গাছের সংখ্যা যাচ্ছে। গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি না পেটলে ভবিষ্যতে গুড়ের উৎপাদন কমবে, যা এই ঐতিহ্যবাহী সরোজগঞ্জ হাটের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।’
সমীকরণ প্রতিবেদন