মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

সিরিয়ায় স্বৈরশাসক আসাদের পতন

  • আপলোড তারিখঃ ০৯-১২-২০২৪ ইং
সিরিয়ায় স্বৈরশাসক আসাদের পতন

দীর্ঘ ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে পতন ঘটল সিরিয়ার স্বৈরশাসক হিসেবে খ্যাত প্রেসিডেন্ট বাশার-আল-আসাদের। তার পতনের মাধ্যমে দেশটিতে ৫৪ বছরের পারিবারিক তথা স্বৈরশাসনের অবসান ঘটল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিদ্রোহীরা রাজধানী দামেস্ক দখল করার পরই প্রেসিডেন্ট আসাদ ব্যক্তিগত বিমানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। যদিও তিনি কোথায় আছেন তা জানা যায়নি। বিদ্রোহীরা আসাদের বাসভবনে ভাঙচুর করেছে। এমনকি তার বাবার ভাস্কর্যও ভাঙচুর করা হয়েছে। দামেস্কে ১৩ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্রোহীদের নেতা। এদিকে, নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়া সমর্থন প্রত্যাহার করার কারণেই আসাদের পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছে। স্বৈরশাসকের অবসান হওয়ার পর সিরিয়ায় স্বস্তি আসবে, নাকি জঙ্গি-যুগের সূচনা হবে, তা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট আসাদের পতন:
সিরিয়ার ‘স্বৈরশাসক’ প্রেসিডেন্ট বাশার- আল-আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এবং সিরিয়া এখন মুক্ত বলে ঘোষণা করেছে দেশটির বিদ্রোহীরা। এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্স সিরিয়ার দুই জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, প্রেসিডেন্ট আসাদ অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে গেছেন। তিনি তার ব্যক্তিগত বিমানে দেশ ছাড়েন বলে রাশিয়া জানিয়েছে। তবে মধ্যপথে আসাদকে বহনকারী বিমান রাডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে তিনি কোথায় গেছেন বা বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) তাদের টেলিগ্রাম হ্যান্ডেলে বলেছে, এর মাধ্যমে একটি অন্ধকার যুগের অবসান ঘটেছে এবং এক নতুন যুগের সূচনা ঘটেছে। দামেস্কের পথে পথে ব্যাপক-সংখ্যক মানুষকে উল্লাস করতে দেখা গেছে। বিদ্রোহীরা বলছে, আসাদ সরকারের নিপীড়নের শিকার শত শত মানুষ যারা কারাবন্দি ও বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে ছিলেন, তারা এখন নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারেন। এদিকে, রাজধানীর সবচেয়ে বড় কারাগার সেদনায়া থেকে হাজার হাজার বন্দিকে মুক্ত করেছে বিদ্রোহীরা।
আসাদ চলে যাওয়ার পর বিমানবন্দর থেকে সরকারি বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ গ্রুপ সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, একটি ব্যক্তিগত বিমান দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে উড়ে গেছে এবং সম্ভবত এতেই প্রেসিডেন্ট আসাদ ছিলেন। অন্যদিকে, সিরিয়ার প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ গাজী আল-জালালি বিদ্রোহী গেরিলাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানোর বিষয়ের সরকারের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারা একটি অন্তর্র্বতী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।
‘৫৪ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান’:
দ্যা সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো নাতাশা হল বিবিসিকে বলেন, ‘এটাকে সত্যিকার অর্থেই মনে হচ্ছে যে সিরিয়ায় ৫৪ বছরের স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত মুহূর্ত’। সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের শাসন শুরু ৭০ দশকের শুরু থেকে। ১৯৭১ সাল থেকে হাফিজ-আল-আসাদ সিরিয়া শাসন করেন। ২০০০ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর তার ছেলে বাশার-আল-আসাদ ক্ষমতায় আসেন। হলের মতে, মূলত আসাদের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাশিয়া ও ইরান অন্য ঘটনায় দুর্বল ও মনোযোগ হারানোর কারণেই তার এই পরিণতি হলো। ২০১৮ সাল থেকে সিরিয়া কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে, যেখানে বাশার-আল-আসাদের কর্তৃত্ববাদী শাসন, কুর্দি বাহিনী এবং ইসলামি বিদ্রোহীরা বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত সিরিয়ায় যুদ্ধ শেষ করা কঠিন বলে বিশ্বাস করেছেন বিশ্লেষকরা। ২০১১ সাল থেকে শুরু হয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ সিরিয়াকে ধ্বংস করে দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু, অবকাঠামোকে ধ্বংস এবং লাখ লাখ মানুষকে চরম দুর্দশায় ফেলেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়ায় যুদ্ধের আগের ২ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০২০ সালে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। আর তুরস্ক বিদ্রোহীদের সমর্থন জুগিয়েছে।
স্বস্তি, গৃহযুদ্ধ নাকি জঙ্গি রাষ্ট্র?
বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা হুগো ব্যাচেগা লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট আসাদ বিদায় নিলে বহু মানুষ খুশি হিবে কিন্তু এর পরই একটি প্রশ্ন নিশ্চিতভাবে আসবে যে, এরপর কী হবে? এবারের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামপন্থি বিদ্রোহী হিসেবে পরিচিত এইচটিএস, যাদের রুট হলো আল-কায়েদা। বহু বছর ধরেই তারা তাদেরকে জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে পরিচিত করানোর চেষ্টা করছে। তবে অনেকেই এটা মানতে রাজি নন। তাদের মতে, গ্রুপটি এখনো চরমপন্থি সহিংস একটি সংগঠন এবং সে কারণেই এরপর দেশটিতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা। আসাদের পতনের দাবিতে সম্প্রতি নতুন করে মাঠে নামে সিরিয়ার বিদ্রোহী জোট সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। তাদের নেতৃত্বে হায়াত তাহরির আল-শাম। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার এই শাখা সংগঠনটিকে জঙ্গি গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তারাই এবার সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরিয়ায় বিপদের আশঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সিরিয়া জুড়ে শরিয়াহ আইন জারি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আফগানিস্তানের তালেবানও এই আশার কথা জানিয়েছে। যদিও ইসরাইলের সঙ্গে গোষ্ঠীটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তবে এই ঘটনায় ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীরা আরো সক্রিয় হয়ে উঠবে সিরিয়ায়। তার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বে। অন্যদিকে, হায়াত তাহরির আল-শামের সঙ্গে কুর্দিদের সম্পর্ক মোটেই ভালো নয়। কুর্দিদের সঙ্গে লড়াই করছে তুরস্ক। তাই নিজেদের স্বার্থেই হায়াত তাহরির আল-শামকে সাহায্য করবে আঙ্কারা। এমন পরিস্থিতিতে কুর্দি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে হায়াত তাহরির আল-শামের সংঘাত বেধে যাওয়াও খুব আশ্চর্যের হবে না। ফলে আসাদের পতনে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়া তো দূর, সংঘাতের আগুন আরো তীব্র হবে বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছেন, তিনি ও তার দল সিরিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এ বিষয়ে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফরম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ‘আসাদ চলে গেছেন। তার রক্ষক রাশিয়া তাকে আর রক্ষা করতে আগ্রহী ছিল না।’



কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী