আলমডাঙ্গা উপজেলা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে কুমারী ইউনিয়নে ১০ দশমিক চার একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। ১৯৭৮ সালে ডেনমার্ক সরকারের সহযোগিতায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি বর্তমানে কতৃর্পক্ষের অবহেলায় প্রায় পরিত্যক্ত হতে চলেছে। প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের পরে থেকে ৪৬ বছর পার হলেও আর কোনো সংস্কার করা হয়নি। কালের বিবর্তনে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান আজ পরিত্যক্ত হতে চলেছে। সেই সাথে ধ্বংস হতে চলেছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কুমারীর জমিদার শৈলেন সাহার বাড়িটি।
জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে এই ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্প গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তৎকালীন সরকার প্রধান প্রেসিডেন্ট শহিদ জিয়াউর রহমানের সময় কুমারী গ্রামে জমিদার শৈলেন সাহার বাড়িতে ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটটি স্থাপন করা হয়। প্রকল্প পরিচালক নূর মোহাম্মদ চৌধুরী (অ্যাডিশোনাল ডাইরেক্টর, প্রাণিসম্পদ) প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আলমডাঙ্গাতে যোগদান করেন। প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে এলাকার তৎকালীন কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়।

তবে প্রতিষ্ঠানটির মূল প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত জমিদার শৈলেন্দ্রনাথের বসত ভিটাটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যাওয়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনিক কাজ এবং ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্লাসরুমগুলো। আর শিক্ষার্থীরা ক্লাশ করছেন জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত প্রায় ভাঙা ছাদযুক্ত মিলনায়তন। যেখানে যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ রয়েছে গাড়ি। তবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ না থাকায় গাড়িগুলো অচল হয়ে পড়ে রয়েছে গ্যারেজে। ৪ জন ড্রাইভারের পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র দুজন। তবে সচল গাড়ি না থাকায় তাদেরও কোনো কাজ নেই।
এদিকে দুটি ছাত্রাবাসের মধ্যে একটি দুইতলা এবং অপরটি তিনতলা। রয়েছে একটি ডাইনিং, একটি কমনরুম, স্টাফ ও অফিসারদের জন্য আবাসিক ভবন। গবাদি পশুর সেড ও ঘাসের মাঠ এলাকাগুলো সম্পূর্ণ অরক্ষিত। জনবল থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে ঘাসের জন্য নির্ধারিত মাঠের কোনো পরিচর্যা করা হয় না বা কোনো ঘাস উৎপাদন করা হয় না। ফলে মাঠটি ধীরে ধীরে জনসাধারণের দখলে চলে যাচ্ছে।

ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে এ পর্যন্ত ১ বছর মেয়াদী ১৪টি ব্যাচের ট্রেনিং সমাপ্ত হয়েছে। ইতমধ্যে ডিপ্লোমা সমমানের সার্টিফিকেটের জন্য পূর্বে যে সকল ব্যাচের ১ বছরের ট্রেনিং করানো হয়েছিল, সে সকল ব্যাচের পুনরায় সেমিস্টার সিস্টেমের দুই বছর মেয়াদী ইন-সার্ভিস মেকাপ কোর্স করানো হয় আরও ১৪টি ব্যাচের, যা এখনও চলমান। বর্তমানে এখানে অধ্যক্ষ পদের বিপরীতে একজন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সহযোগী অধ্যাপক একজন, সহকারী অধ্যাপক দুইজন, ভেটেরিনারি সার্জন দুইজন, প্রভাষক ছয়জন, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা একজনসহ প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে মোট ৫৩ জন কর্মরত আছেন।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ৯২ বছর বয়সী মজিবর রহমান জানান, আলমডাঙ্গা উপজেলা তথা বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কুমারি গ্রামে। তৎকালীন জমিদার শৈলেন সাহার ১০.৪ একর জমি ও পুরাতন জমিদার বাড়িসহ দান করে দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানের জন্য। সেই প্রতিষ্ঠান আমরা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছি। আগামীতে যে নেতৃত্ব আসবে, তাদের কাছে অনুরোধ, এই প্রতিষ্ঠান বাঁচানোর সার্থে যা করণীয়, তারা যেন তা করেন।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক গোলাম হায়দার জানান, সরকারের সদিচ্ছা আছে ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটটি এখানে থাক। তবে যেহেতু ভেটেরিনারি কলেজটি এখান থেকে উঠে গেছে, তাই সেটা আর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে কি না জানি না। তবে এলাকবাসী বা জনপ্রতিনিধিগণ তদবির করতে পারলে এখানে একটি ডিপ্লোমা ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কারণ এখানে নতুন স্টাফ লাগবে না, অবকাঠামো যা আছে, তা রিপিয়ারিং করলে সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে সরকার তখন এখানে নতুন অবকাঠামো গড়ে তুলবে।
এদিকে, আলমডাঙ্গাবাসী চায় এই ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আবার তার প্রাণ ফিরে পাক। সংস্কার করা হোক জমিদার বাড়িটি, ১৯৭৮ সালে শহিদ জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটি। তাই চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আগামীতে যিনি এমপি নির্বাচিত হবেন, তার মাধ্যমে সরকারের সুদৃষ্টি পেলে এই অবহেলিত ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট আবারও প্রাণবন্ত করতে পারে। পূর্ণাঙ্গ কলেজ না হলেও একটি ডিপ্লোমা ভেটেরিনারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে পারে।
সমীকরণ প্রতিবেদন