দুষ্কৃতিকারীদের দখলদারিত্ব থামছেই না। একের পর এক দখল আর ত্রাসের চেষ্টা জীবননগর উপজেলাব্যাপী। হাট-বাজার, বিল-জলমহাল নিয়ে উত্তেজনা লেগেই আছে। উপজেলার সিংড়া কর্চ্চাডাঙ্গার বিল নিয়ে আন্দুলবাড়িয়া এলাকায় চলছে চরম উত্তেজনা। দুই পক্ষের কোন্দলে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন এলাকাবাসী। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহমুদ হাসান খান বাবু ও সদস্যসচিব শরীফুজ্জামান শরীফ দলের নেতা-কর্মীদের সাথে মিটিং করে দখলবাজি, চাঁদাবাজি থেকে বিরত থাকতে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। এমনকি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের কয়েক নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এরপরও বেপরোয়া কিছু উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মী।
এবার অভিযোগ উঠেছে, জীবননগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খোকন খানের বিরুদ্ধে। তবে একটি পক্ষ বলছে, খোকন খানের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় একটি সুবিধাবাদী চক্র সিংড়া কর্চ্চাডাঙ্গার বিলটি দখল নেয়ার চেষ্টা করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নে অবস্থিত সিংড়া-কর্চ্চাডাঙ্গা জলাশয়। ৭.১৬ একর আয়তনের এই জলমহালটি ২০১৮ সালে ইজারা নেন কর্চ্চাডাঙ্গা গ্রামের মৃত রহিম বিশ্বাসের ছেলে ও কর্চ্চাডাঙ্গা যুব উন্নয়ন সমবায় সমিতির সভাপতি মো. হায়দার আলী। তবে তিনি অসুস্থ থাকায় সমিতির মাধ্যমে বিলটি পরিচালনা করছিলেন হায়দার আলীর ছেলে মো. জাহাঙ্গীর।
বিলটি সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, বিলটির মালিকানা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগে ৩৫৪৪/২০০৭ নম্বর সিভিল রিভিশন-এর রায়/আদেশের (রায়/আদেশের তারিখ: ২৬.১১.২০১৪) বিরুদ্ধে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ইং তারিখে আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নম্বর ১২৮৮/২০২০ মামলা দায়ের/রুজু করা হয়। বর্তমানে ওই মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারধীন/শুনানির অপেক্ষায় আছে।
এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট তারিখে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দেশ থেকে পালানোর পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়। বিভিন্ন স্থানের মতো জীবননগর উপজেলার বেশ কয়েকটি বিল অবৈধভাবে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের দখল থেকে নতুন দখলের প্রচেষ্টা শুরু হয়। কিছু কিছু স্থানে আওয়ামী লীগেরই অপর গ্রুপ আবার কিছু কিছু স্থানে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ ওঠে। জীবননগর উপজেলার সিংড়া-কর্চ্চাডাঙ্গার বিল খুব বেশি বড় না হলেও এই বিলটি নিয়ে স্থানীয় দখলদারিত্বে শুরু হয় নতুন দ্বন্দ্ব। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মদদে দখল করার অভিযোগ উঠেছে।
হায়দার আলীর ছেলে মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমাদের সকল কাগজপত্র ঠিক ছিল। আমরা কেউ সেভাবে আওয়ামী লীগ করি না। কোনো পদে কেউ নেই। বিলটি মাত্র ৭.১৬ একরের, তুলনামূলক অন্য বিলের মতো বড় বিলও নয়। আমাদের জেলেদের অনেক পরিশ্রম ও ঋণ করে বিলে মাছ দেয়া ছিল। আমরা বারবার বলেছি, অন্তত আমাদের মাছগুলো ধরে নেওয়ার সুযোগ দিন। তাও আমাদের দেয়া হচ্ছে না। হুমকি-ধমকি দিয়ে বিলের কাছেই আমাদের যেতে দেয়া হচ্ছে না। অনেক টাকার মাছ ছিল। জোর করেই বিলের দখল নিয়ে নিচ্ছে। পুলিশের লোকজন আসবে না বলে, আমাদের মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমরা কেউ সাহস করতেই পারছি না। সিংড়া গ্রামের মোক্তার, বাসার, রহম ও আলা সরাসরি বিলের দখল নিচ্ছে।’
বিল দখলের অভিযোগ ওঠা দখলকারীদের অন্যতম মো. আলাকে মুঠোফোনে বিল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কিছু জানেন না বলেই ফোন কেটে দেন। একাধিকবার তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মুঠোফোন রিসিভ করেননি।
আন্দুলবাড়িয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি তছেরের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিল সম্পর্কে কিছু জানতে হলে মোক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করেন। সে আর থানা সভাপতি বিল সম্পর্কে জানে। আমি কিছু জানি না।’
আন্দুলবাড়িয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোক্তারের কাছে মুঠোফোনে বিল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি বলেন, ‘আমি যা বলি আপনি সেই মতো কাজ করেন। বিল সম্পর্কে জানতে আমাদের থানা সভাপতির কাছে জিজ্ঞেস করেন। ভালো মন্দ যা বলার তিনিই বলবেন।’
এ বিষয়ে জীবননগর থানা বিএনপির সভাপতি খোকন খান বলেন, ‘আগে আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ডাক করতাম। পরে বোধয় উপজেলা থেকে করতো। দীর্ঘ ১৭ বছর এটার খোঁজ রাখিনি। আবার শোনা যাচ্ছে, বিলটা নাকি কেউ একজন নিজের নামে করে নিয়েছেন। এখন কাগজপত্র না দেখা পর্যন্ত কিছু বলতে পারব না। আওয়ামী লীগের আমলে বিলটা বেদখল হয়ে যায়। নতুন করে স্বাধীনতা পাওয়ার পর পুনরুদ্ধার করে আমাদের লোকজন, যাদের কাছ থেকে বিল ওরা কেড়ে নিয়েছিল। আমরা এটাকে পুনরুদ্ধার বলছি। যারা দখলবাজ ছিল, তাদের কাছ থেকে আমরা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি, এই।’
সমীকরণ প্রতিবেদন