সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু আগের দু’বারের মতো মসৃণ হবে না তার সরকার পরিচালনা। কারণ এবার দল হিসেবে তার দল বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এ অবস্থায় সরকার গঠন করলে তা হবে মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল। কোনো কারণে মিত্ররা অখুশি হলে ভেঙে যেতে পারে সরকার। এ জন্য নিজের মতো করে সরকার চালাতে পারবেন না তিনি। এর ওপর আছে এবার শক্তিধর ইন্ডিয়া জোট। তারাও সরকারকে এবার ছেড়ে কথা বলবে না। ফলে নতুন সরকারকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্যদিয়ে যেতে হবে।
দল হিসেবে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তার নেতৃত্বে এনডিএ জোট ২৯৩ আসনে জয় পেয়েছে। জোটগতভাবে প্রাপ্ত আসনের ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। এ জন্য বুধবার দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রেসিডেন্ট ধ্রুপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের ও মন্ত্রিপরিষদের পদত্যাগপত্র জমা দেন। নতুন সরকার শপথ না নেয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মুর্মু। ওই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পরে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভা ভেঙে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মুর্মু। তিনি এক্সে এক বার্তায় ১৭তম লোকসভা বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। তিনি লিখেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ১৭তম লোকসভা ভেঙে দেয়ার জন্য মন্ত্রিসভার পরামর্শ গ্রহণ করেছেন প্রেসিডেন্ট মুর্মু।
প্রেসিডেন্ট সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের ধারা (২)-এর (বি) উপ-ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য ১৭তম লোকসভা ভেঙে দেয়ার আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। মঙ্গলবার ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পরদিন পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরবর্তী সরকার গঠনের আগে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে লোকসভা ভেঙে দিয়েছেন তিনি। ফলে শনিবার তৃতীয়বারের মতো শপথ নেয়ার কথা জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এটা সম্পন্ন হলে তিনি হবেন হ্যাটট্রিক প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেস নেতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর পর তিনি হতে যাচ্ছেন টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি ও ভারতের বিভিন্ন মিডিয়া। মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে আসন পায় ২৮২টি। ২০১৯ সালে পায় ৩০৩ আসন। কিন্তু এবার তা বহুলাংশে কমে ২৪০-এ নেমে আসে। ফলে দল হিসেবে বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে হলে একটি দলকে কমপক্ষে ২৭২ আসন পেতে হয়।
সে হিসেবে বিজেপি’র আসন আছে ৩২টি কম। এখন তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করতে হলে তাকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্সের (এনডিএ) সদস্যদের জয় করা ৫৩টি আসনের ওপর ভর করতে হবে। এ জন্য মোদির সরকার এককভাবে স্বনির্ভর থাকবে না। তাদেরকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু মোদির নতুন সরকার গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। তারাও সরকার গঠনের চেষ্টায় তৎপর। মোদি শপথ নেয়ার ঘোষণা দিলেও তাদের প্রতিক্রিয়া কি তা জানা যায়নি। তবে এনডিএ বা ইন্ডিয়া- উভয় জোটের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিএস) এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ)। এবারের নির্বাচনে তারা পেয়েছেন যথাক্রমে ১৬ ও ১২ আসন। এই দুই দলের মিলে মোট আসন দাঁড়ায় ২৮। এ জন্য তাদেরকে বাগিয়ে নিজেদের জোটে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইন্ডিয়া জোট। ভারতীয় পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে এ জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বর্ষীয়ান নেতা শারদ পাওয়ারকে। তাছাড়া তো যোগাযোগ অব্যাহত আছেই। যদি ইন্ডিয়া জোট এ দুটি দলকে তাদের দিকে ভেড়াতে পারে তাহলে মোদির এনডিএ জোটের মোট আসন ২৯৩ থেকে কমে দাঁড়াবে ২৬৫। তখন এনডিএ সরকার গঠন করতে পারবে না। তখন ইন্ডিয়া জোটের আসন দাঁড়াবে ২৬৮টি। ফলে তাদের ২৭২ পূরণ করতে বাকি থাকবে ৪টি আসন। তারা অন্য ছোট দলগুলোর কাছ থেকে সেই ৪টি আসন নিয়ে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখতেই পারে। ভারতে নির্বাচনের পর চন্দ্রবাবু নাইডু ও নীতিশ কুমারকে নিয়ে তাই এত আলোচনা। এ জন্য তাদের দু’জনকে বলা হচ্ছে কিংমেকার। তারা যেদিকে ঝুঁকবেন, সরকার গঠনের সুযোগ তাদের সামনে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজেপি দাবি করেছে, এই দুই নেতা তাদেরকে লিখিত দিয়েছেন যে, তারা এনডিএ’র সঙ্গেই থাকবেন। উত্তর প্রদেশের বারাণসি থেকে লোকসভার নির্বাচনে বিজয়ী হন মোদি। তিনি কংগ্রেসের প্রার্থী অজয় রায়কে প্রায় দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তৃতীয়বার এমপি নির্বাচিত হন। মঙ্গলবার রাতেই তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, তৃতীয় দফায় সরকার গঠন করবে এনডিএ। নির্বাচনের ফলকে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতন্ত্রের বিজয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। বুধবার তিনি বিদায়ী মন্ত্রিপরিষদের শেষ বৈঠক আহ্বান করে তাতে সভাপতিত্ব করেন।
বিজেপি এবার লোকসভা নির্বাচনে উচ্চাকাক্সক্ষী টার্গেট স্থাপন করেছিল। তারা ধরে নিয়েছিল কমপক্ষে ৩৭০ আসনে তারা জিতবে। ফলে তাদের আসন হবে ৪০০+এনডিএ অংশীদাররা। কিন্তু তাদের পেছন থেকে পেরেক মেরে দিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী ইন্ডিয়া জোট। এই জোট আগের চেয়ে অনেক ভালো ফল করেছে। তারা মোট ২৩২ আসনে জয় পেয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বিজেপি’র অগ্রযাত্রাকে তারা থামিয়ে দিয়েছে। আমেথিতে বিজেপি’র গুরুত্বপূর্ণ এমপি ও সাবেক মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে পরাজিত করেছেন কংগ্রেসের কিশোরী লাল শর্মা। অথচ আগের নির্বাচনে এই আসনে স্মৃতি ইরানির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। কংগ্রেস এবার বিজেপি’র গতি রুখে দিলেও তারা একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। বিজেপি পেয়েছে ২৪০ আসন। তারা ওড়িশায় ২১ আসনের মধ্যে ২০টিতে জয় পেয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে ২৫ আসনের মধ্যে ২১টিতে, মধ্য প্রদেশে ২৯ আসনের মধ্যে ২৯টিতেই এবং বিহারে ৪০ আসনের মধ্যে ৩০টিতে হয় পেয়েছে। তবে দক্ষিণের রাজ্য কেরালায় প্রথমবার লোকসভার আসন পেয়েছে বিজেপি। এর মধ্যদিয়ে তারা ওই রাজ্যে তাদের অ্যাকাউন্ট খুললো। বিজেপি ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণে লড়াই চালিয়েছে। দলটি তামিলনাড়ুতে একটিও আসন পায়নি। সেখানে ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং ইন্ডিয়া জোট ৩৯ আসনের সবটাতেই জিতেছে।
মোদিকে অভিনন্দন জানালেন যারা
বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবারের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের সরকার। এর মধ্যে আছে মৌরিতানিয়া, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র। অভিনন্দন জানিয়েছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজু। এক্সে দেয়া পোস্টে তিনি দুই দেশের পারস্পরিক সুবিধা ও স্থিতিশীলতায় সহযোগিতার মধ্যে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে, নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচণ্ড অভিনন্দন জানিয়েছেন মোদিকে। তারা মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট এক্সে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ’কে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। বলেছেন, ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করতে চায় শ্রীলঙ্কা। জোটবদ্ধভাবে বিজয়ী হওয়ায় মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রচণ্ড। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের চর্চা সম্পন্ন করার জন্য তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। অভিনন্দন জানিয়েছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। তিনিও সম্পর্ক শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই রকম ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। পার্লামেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার ভারতের প্রশংসা করেন।
সমীকরণ প্রতিবেদন