চুয়াডাঙ্গার মাঠে বোরো ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে। ধান কাটতে ও ঝেড়ে ঘরে তুলতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে চলাতেও খুব বেশি ক্ষতির শঙ্কা নেই তাঁদের। কৃষকরা বলছেন, ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না আসায় এবার বোরো ধানের বেশি ক্ষতি হয়নি। জেলা কৃষি বিভাগও বলছে, খুব বেশি ক্ষতির শঙ্কা নেই। গরমের কারণে এ অঞ্চলের ধানের ফলনে সামান্য তারতম্য হতে পারে। তবে ধান কাটা শেষ না হলে সেটা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। চুয়াডাঙ্গা সদর এবং আলমডাঙ্গা উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকার মাঠ সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এসব অঞ্চলের মাঠে কৃষকরা বোরো ধান কাটতে ও ঝাড়তে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বেশির ভাগ জমির ধানকাটা হয়ে গেছে। কিছু কিছু এলাকায় দেরিতে রোপণ করা ধান এখনো পাকেনি। সদর উপজেলার বুজরুকগড়গড়ি মাঠে গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন জমিতে কৃষকরা ধান কাটছেন।
কৃষক মনোয়ার আলী ওই মাঠেই তার দেড় বিঘা জমির ধান কাটছিলেন। তিনি বলেন, ‘এ বছর ধানে কোনো আগাবিগে যায়নি। প্রত্যেকবারই চৈত মাসের আদাআদি (চৈত্র মাসের মাঝামাঝি বা চৈত্র মাসের সময়ে) ঝড়-ঝাপ্টা হয়, ধান গইড়ে (ঝড় নুয়ে পড়া) যায়। এবার ধান সুজা (সোজা) আছে। ফলন ভালো হবে বলেই মনে হচ্ছে। আমাগের (আমাদের) মাঠে দু’একজনের ধান পাকেনি। তাদের একটু সমস্যা হচ্ছে। প্রত্যেকদিন পানি দিতি হচ্ছে।’
একই মাঠে একা ধান কাটছিলেন কৃষক মুক্তার হোসেন। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, তার ৮ কাঠা জমিতে ধান ছিল। সব কাজ তিনি নিজেই করেছেন। ধান পেকে যাওয়ায় কাটার কাজও তিনি একাই করছেন। তিনি বলেন, ‘এবার শেষের দিকে একটু বেশি পানি লেগেছে। আর কয়েকদিন থাকলে হয়ত ধান গাছের পাতা পুড়ে যেত। এখনো মাঠে যাদের ধান পাকতে সময় লাগবে, তারা একটু চিন্তায় আছে। ওদের খরচও বেশ হবে।’
সদর উপজেলার সুমিরদিয়া মাঠের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘আমি ১২টাকা দিয়ে ডিজেল কিনেছি। আর এখন ১১২ টাকা লিটার ডিজেলের দাম। আমার ধান নাবি, সব দিক দিয়ে খরচ হচ্ছে। আমার ধান পাকতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে। আমার খরচ বেশি হবে মনে হচ্ছে। চিন্তায় আছি এতো খরচ করে ধানের পাতা পুড়ে না যায়।’ আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘আমার তিন বিঘা ধান ও দুইটা সেচ মেশিন আছে। যাদের ধানের অবস্থা এখনো কাঁচা, তাদের একদিন/দুইদিন পর সেচ দিতে হচ্ছে। আমি নিজের জমির পাশাপাশি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বিঘা জমিতে সেচ দিয়ে থাকি।’
আলমডাঙ্গা উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আমার ১৫ বিঘা জমিতে ধান ছিল। এবার খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। আমার ৯ বিঘা জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। শেষের দিকের তিন বিঘা মনে হয় ক্ষতি হয়ে যাবে। রোদে এবং গরমে পাতা পুড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছি। আর পানি দেওয়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই শুকিয়ে যাচ্ছে। জমিতে পানি না থাকলে ধান ঝরে যেতেও পারে। আমি ২০-২৫ দিন থেকে ধানের জমিতে বেশি বেশি পানি দিচ্ছি। বোরো ধানের সাথে ফল ও সবজিসহ অন্যান্য ফসল নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক।’
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের কৃষক ছাত্তার আলী বলেন, ‘গরমে কলা গাছের কাঁদি পড়ে যাচ্ছে। বেগুন, শসা ও করলাও রোদে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত সেচ দিয়েও ফসল বাঁচানো যাচ্ছে না।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, চুয়াডাঙ্গায় বেশির ভাগ জমিতে ধান কাটা হয়েছে। আর কিছু নাবি ধান মাঠে আছে। এ জেলায় ধানের খুব বেশি ক্ষতির শঙ্কা নেই। রোদের কারণে ফলনে সামান্য তারতম্য হতে পারে। এখনো যাদের ধান দুধ পর্যায়ে আছে, মূলত তাদের নিয়েই কিছুটা চিন্তা আছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আমাদের মাঠকর্মীসহ সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করছেন। আমরা ধানে পানি দেওয়াসহ অনান্য পরামর্শ দিচ্ছি। তাছাড়া, গরমের কারণে অনান্য ফসলেরও ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কোন কোন ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা এখনো নিরূপণ করতে পারিনি। তবে দু-একদিনের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ বলা যাবে।’
সমীকরণ প্রতিবেদন