চুয়াডাঙ্গায় তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জেলার সাধারণ মানুষ। একটানা কয়েকদিন তীব্র তাপদাহ চলায় জেলা সদর হাসপাতালে বেড়েই চলেছে জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। শয্যা সংকুলান না হওয়ায় রোগীরা হাসপাতালের বারান্দা ও করিডোরে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত শনিবার থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত তিনদিনে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে বহিঃবিভাগে ১ হাজার ৯৩৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। জেলার সবকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই অতিরিক্ত রোগীর চাপ রয়েছে। গতকাল সোমবার বেলা তিনটায় এ জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এসময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। এর আগে রোববার বেলা তিনটা ও ছয়টায় এ জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এসময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ১৮ শতাংশ। এটি দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল।

চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ এপ্রিল জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর থেকে ক্রমেই উপরে উঠতে থাকে তাপমাত্রার পারদ। ১৩ এপ্রিল ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৪ এপ্রিল ৩৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি ও ১৫ এপ্রিল এ জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৬ এপ্রিল ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় ৪০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এটি দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল। এরপর বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এদিন চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে যৌথভাবে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টায় ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এটিও সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল। এরপর শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি এ মৌসুমের সবোর্চ্চ তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গা জেলায়। সর্বশেষ রোববার বেলা তিনটা ও ছয়টায় এ জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এসময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ১৮ শতাংশ। এটিও দেশের সবোর্চ্চ তাপমাত্রা ছিল।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ জামিনুর রহমান বলেন, গতকাল সোমবার বেলা তিনটায় চুয়াডাঙ্গা জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এসময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ১৬ শতাংশ। আগামী কয়েকদিন আবহাওয়া পরিস্থিতি একই রকম থাকবে। এসময় তাপমাত্রা আরও বাড়বে।

এদিকে, গরমে হাসপাতালে জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে প্রচণ্ড ভিড় থাকায় রোগী দেখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ডাক্তারদের। চুয়াডাঙ্গা জেলা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে গরমজনিত কারণে বিভিন্ন অসুস্থতা নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক মিলিয়ে মোট ২৫৫ জন চিকিৎসাধীন আছেন। এদিন হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ১৪৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ওয়ার্ডে ৮৯ জন ও মহিলা ওয়ার্ডে ৫৭ জন। শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ৬৫ জন ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ৪৪ জন নারী, পুুরুষ ও শিশু। এর আগে রোববার হাসপাতালের ভর্তি হয়েছিলেন ১৭৪ জন। এ মধ্যে পুরুষ ওয়ার্ডে ৫৪ জন ও মহিলা ওয়ার্ডে ৪১ জন। শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ৩৭ জন ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ৪২ জন নারী পুুরুষ ও শিশু।
গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৫৫ জন। এ মধ্যে পুরুষ ওয়ার্ডে ৪০ জন ও মহিলা ওয়ার্ডে ৩২ জন। শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ২৯ জন ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ৫৪ জন নারী পুুরুষ ও শিশু। গত বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে গরমজনিত কারণে বিভিন্ন অসুস্থতা নিয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক মিলিয়ে মোট ২০৫ জন চিকিৎসাধীন আছেন। এদিন হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ১২৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ওয়ার্ডে ৫৩ জন ও মহিলা ওয়ার্ডে ৭৪ জন। শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ৪৬ জন ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ৩২ জন নারী, পুুরুষ ও শিশু। গত বুধবার হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ৮১ জন। এ মধ্যে পুরুষ ওয়ার্ডে ৩৫ জন ও মহিলা ওয়ার্ডে ৪৬ জন। শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ৩১ জন ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ৩২ জন নারী পুুরুষ ও শিশু।
এদিকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে বহিঃবিভাগেও অতিরিক্ত রোগীর চাপ হচ্ছে। প্রতিদিনই শুধুমাত্র চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বহিঃবিভাগ থেকেই ৫০০ জনের ওপরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, গতকাল সোমবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন ৬২৮ জন। শনিবার ৪৮৭ জন এবং রোববার ৮২০ জন চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। গত তিন দিনে জেলা সদর হাসপাতালের শুধুমাত্র বহিঃবিভাগেই চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ৯৩৫ জন। চুয়াডাঙ্গা জেলার আরও তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও প্রায় একই অবস্থা। হাসপাতালের বেডে সংকুলান না হওয়ায় মেঝেতে চিকিৎসা নিচেছন অনেকেই। বেশি গুরুতর অসুস্থ হলে সদর হাসপাতালে রেফার্ড করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জীবননগরে তীব্র তাপদাহে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেড়েছে রোগীর চাপ। ৩১ শয্যার হাসপাতালটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ছিল ৬৬ জন। তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ছিল ৬৩ জন। এছাড়া বহিঃবিভাগে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালে আগত রোগীদের অধিকাংশ শিশু। একই অবস্থা জেলার দামুড়হুদা ও আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। দামুড়হুদা হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৩৬ জন ও বহিঃবিভাগে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৬ জন। প্রতিদিনি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন।
গতকাল সোমবার চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, শয্যা সংখার কয়েকগুন বেশি রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ওয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় রোগীরা মেঝে ও বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মা তাসলিমা খাতুন বলেন, তীব্র গরমে সারারাত মেয়ে ছটফট করেছে। সকালে সে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। ওয়ার্ডে এসে দেখি এখানে রোগীর অনেক চাপ। উপায় না পেয়ে মেঝেতেই আছি। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বয়স্ক বৃদ্ধ কাশেম আলী বলেন, ‘গরমে খুব কষ্ট। এমন হচ্ছি কেনে তা কি জানি! আগে চুয়াডাঙ্গায় এতো রোদ-গরম পড়েনি। এই ক’বছর থেকে দেখছি খুব গরম পড়ছে। হাসপাতালে এসেও জায়গা পাইনি। নিচেই আছি।’
জেলা সদর সদর হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স রেহেনা খাতুন বলেন, ‘অসহ্য গরমে ডিউটি করায় মুশকিল হয়ে পড়ছে। তার ওপরে বাড়তি রোগীর চাপ। শয্যা সংখ্যার থেকে অনেক বেশি রোগী চিকিৎসাধীন থাকছেন। এত রোগীকে চিকিৎসা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। পাঁচজনের কাজ একজন করেও কূল দিয়া যাচ্ছে না।’

মেডিসিন ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স আলিয়া খাতুন বলেন, ‘ওয়ার্ডের মেঝেও জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে বারান্দায় থেকে অনেকে সেবা নিচ্ছেন। গরমে আমাদের অবস্থাও ভালো না। এতো ভিড় সামলে উঠতে আরও লোকবল প্রয়োজন।’ দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মহিবুল্লাহ বলেন, এখন প্রতিদিনই রোগীর চাপ বেশি থাকে। বহিঃবিভাগেও প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. উম্মে ফারহানা বলেন, গরম বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়ছে। ঈদের পর থেকে এখন পর্যন্ত একটানা শয্যা সংখ্যার বেশি রোগী বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন থাকছেন। শয্যা সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের যেমন বারান্দা ও করিডোরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, একই সঙ্গে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৫০০ জনের ওপরে বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সব দিকেই এখন চাপ যাচ্ছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন