বঙ্গবাজারে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ১০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি
- আপলোড তারিখঃ
০৪-০৪-২০২৩
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
ঢাকার গুলিস্তানের বঙ্গবাজারে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে ফায়ার সার্ভিসের আটজনসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১১ জন। ফায়ার সার্ভিসের আহত সদস্যরা হচ্ছেন- রবিউল ইসলাম অন্তর (৩০), আতিকুর রহমান রাজন (৩৫), মেহেদি হাসান (২৮), ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক বাবুল চক্রবর্তী (৫৮) ও সোহেল (৪৮)। এর মধ্যে মেহেদি হাসানকে শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। আহত অন্য ব্যক্তিরা হচ্ছেন- নিলয় (৩৫), শাহিন (৪০), রিপন (৪০), রুবেল (৩২), দুলাল মিয়া (৬০), মো. সুমন মিজি (৪৮) ও বঙ্গবাজারের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও মো. সোহেল (৪৮)। তবে ভয়াবহ এ ঘটনায় কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, আগুনে পর্যায়ক্রমে সাতটি মার্কেটের প্রায় পাঁচ হাজার দোকান পুড়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অন্তত দশ হাজার কোটি টাকার। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি,র্ যাব, পুলিশ, আনসার, তিতাস গ্যাস, ওয়াসা, ডেসকো, রোবার স্কাউটসহ সেবাদানকারী সব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে আগুন নেভাতে সহায়তা করেছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণের কাজ চলছিল। অগ্নিকান্ডের কারণে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পরিচালিত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় সেবাপ্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। প্রায় ৯ ঘণ্টা পর এ কার্যক্রম ফের শুরু হয়। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীরা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদুল্লাহ পুকুর থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় সময়মতো কাজ না করার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর ভাঙচুর করেছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণে বঙ্গবাজারের চারদিকে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আগুনের ভয়াবহতা দেখে ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন ঢাকার সব স্টেশন থেকে গাড়ি পাঠানোর নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকার সব ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। সব মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসের প্রায় সাড়ে ৬ শ সদস্য আগুন নেভানোর কাজ করে। তাতেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসছিল না। এসময় ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। সব মিলিয়ে বিভিন্ন বাহিনীর অন্তত ৫ হাজার সদস্য সেখানে অগ্নিনির্বাপণ কাজে অংশ নেন। সব বাহিনীর অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে আগুন নেভাতে। সাত ঘণ্টার চেষ্টার পর বেলা সাড়ে ১২টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আর বিকাল চারটা নাগাদ আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, আগুনে কাপড় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুরো রাস্তাজুড়ে পানি আর পানি। কালো পানিতে পুরো এলাকা তলিয়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণে বঙ্গবাজারের চারদিকে এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক যানজটের। আশপাশের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। অগ্নিকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী তরুণ ব্যবসায়ী সুমন (৩৫) বলেন, ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের সামনের মার্কেট বঙ্গবাজার মার্কেট নামে পরিচিত। তবে মার্কেটের ভেতরে কয়েকটি ভাগ আছে। পূর্বদিকে পুলিশ সদর দপ্তর লাগোয়া অংশটি গুলিস্তান মার্কেট নামে পরিচিত। আমার দোকান ছিল গুলিস্তান মার্কেটের দ্বিতীয় তলায়। আমি প্যান্টের পাইকারি ব্যবসা করি। ২০১১ সাল থেকে এখানে ব্যবসা করছিলাম। আমার বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানাধীন পূর্ববোয়ালিয়া গ্রামে। ঢাকার যাত্রাবাড়ীর দিকে আমার বাসা। তিনি বলেন, বঙ্গবাজারের অধিকাংশ দোকানের কর্মচারীরাই দোকানে থাকেন না। আমার দোকানের কর্মচারী থাকেন পাশেই সিদ্দিকবাজার এলাকায়। ভোর ৬টায় কর্মচারী আমাকে মার্কেটে আগুন লাগার খবর দেয়। আমি দ্রুত বঙ্গবাজারের দিকে আসি। সব মিলিয়ে ৪৫ মিনিটের মতো সময় লাগে আমার বঙ্গবাজার আসতে। সকাল থাকায় যানজট কম ছিল। তাই দ্রুত পৌঁছে যাই। এসে দেখি সব শেষ।
স্থানীয়রা জানান, মূলত ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আগুন লেগেছে। প্রথমে আগুন লাগে পুলিশ সদর দপ্তরের পশ্চিম দিকে থাকা ৬তলা ভবন লাগোয়া আদর্শ মার্কেটে। মার্কেটটি কাঠ, আর টিন দিয়ে তৈরি। সেখানে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকলে এক পর্যায়ে আগুন লেগে যায় পুলিশের ওই ছয়তলা ভবনে। ভবনটির পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় ব্যারাক আছে। দ্বিতীয়তলা পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম চলে। ভবনটির দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থতলায় থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়ে গেছে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির পেছন দিকে রাখা অন্তত শতাধিক মোটরসাইকেল দ্রুত পুলিশ সদস্যরা টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে ফেলেন। মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্কে থাকা অকটেন বা পেট্রোলে ভয়াবহ ঘটনার আশঙ্কা ছিল। ভবনটির নিচতলায় দক্ষিণ দিকে পুলিশ মার্ট নামে সুপারশপ আছে। আগুনে পুরো ভবনের দরজা-জানালার কাঁচ ও আসবাবপত্র পুড়ে ভস্মীভূত হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় পুলিশ সদর দপ্তরে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ কর্মকর্তারা আতঙ্কে ভবন ছেড়ে নিচে নেমে আসেন। কর্মকর্তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, আগুনের কালো ধোঁয়া সেখানে কাজ করা যাচ্ছিল না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আতঙ্কের কারণে বন্ধ হয়ে যায় সব ভবনের দাপ্তরিক সব কাজকর্ম।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, বিদ্যুৎ বেগে আগুন দক্ষিণ দিক থেকে বরাবর উত্তর দিকে যেতে থাকে। মুহুর্তেই আগুন লেগে যায় বঙ্গবাজারের দক্ষিণ দিকটায়। বঙ্গবাজারের দক্ষিণ দিকে ঢাকা মহানগর হকার্স মার্কেট। এই মার্কেটটিও পুলিশ সদর দপ্তরের ঠিক পেছনে। মার্কেটটি তিনতলা। কাঠ আর টিন দিয়ে তৈরি। ফ্লোরগুলো কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি। আগুন দেখতে দেখতে বঙ্গবাজার আদর্শ মার্কেট লাগোয়া বঙ্গবাজার, মহানগর মার্কেট, মহানগরী কমপ্লেক্স ও গুলিস্তান মার্কেটসহ মোট ৫টি মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আগুনের তীব্রতা আরও বাড়তে থাকলে আগুন লেগে যায় বঙ্গবাজার লাগোয়া সাততলা এনেক্সো মার্কেটে। মার্কেটটির আন্ডারগ্রাউন্ডে অর্থাৎ মাটির নিচে বিরাট পাইকারি শাড়ির দোকান। এ মার্কেটটির ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলায় আগুন লাগলেও অন্য তলায় আগুন লাগতে পারেনি। বঙ্গবাজার পুরোটা ভস্মীভূত হওয়ার সময় বাতাসে আগুন ছড়িয়ে পড়ে রাস্তার পশ্চিম দিকে থাকা চারতলা ইসলামিয়া মার্কেট ও ছয়তলা বঙ্গবাজার হোমিও কমপ্লেক্স মার্কেটে।
এদিকে ভয়াবহ আগুন লাগার খবর পেয়ে ছুটে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ডক্টর এ কে এম গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, ভোরেই আমি বঙ্গবাজারে আগুন লাগার খবর পাই। ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তরফ থেকে আমাদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়। বিশেষ করে পানির। কারণ আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের যে পরিমাণ পানি ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি দ্রুত শহীদুল্লাহ যাই। গিয়ে দেখি আগে থেকেই হলের প্রভোস্ট তার ছাত্রদের নিয়ে ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করছেন। দেখে ভালো লাগে। হলের প্রভোস্টের সঙ্গে কথা বলি। মানবিক কারণে আমরা আমাদের ছাত্রদের ফায়ার সার্ভিসকে আরও বেশি সহায়তা করতে বলি। তিনি বলেন, এমন একটি মানবিক বিপর্যয়ের সময় অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। যেখানে হাজার হাজার মানুষের রুটি-রুজির বিষয়, জানমালের ক্ষয়ক্ষতির বিষয় সেখানে তো কোনো কথাই নেই। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দ্রুত শহীদুল্লাহ পুকুর থেকে যত পানি লাগে নিতে বলি। যদিও ততক্ষণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পুকুরে পাম্প বসিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। পুকুরটি থেকে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ১৭টি পাম্প বসিয়ে ফায়ার সার্ভিস বেলা চারটা পর্যন্ত পানি নিয়েছে। সেই পানিতেই এক পর্যায়ে দুপুর প্রায় ১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এর আগে কর্মচারী হাসপাতালের সামনের পুকুর থেকে পানি নিয়েছে। সেখানকার পানি শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা চায় ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ে সাংবাদিকদের বলছিলেন, আগুনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, মনে হচ্ছিল পানি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। আগুন নিচে পড়তেই পারছিল না। আগুনের তাপে পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ ও ছাত্ররা পানিসহ সার্বিকভাবে সহায়তা না করলে আগুন নেভানো বড্ড কঠিন হয়ে পড়ত। স্থানীয়রা জানান, পুলিশ সদর দপ্তরের পেছনের দিকে লাগোয়া আদর্শ মার্কেট থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। মার্কেট লাগোয়া পুলিশ সদর দপ্তরের একটি ভবন আছে। আগুন ওই ভবনেও লাগে। ফায়ার সার্ভিস মার্কেট ও পুলিশ সদর দপ্তরের ওই ভবনটির আগুন একই সঙ্গে নেভানোর চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু ব্যবসায়ীদের একটি মহল অভিযোগ করেন, ফায়ার সার্ভিস পুলিশ ভবন রক্ষা করতে যতটা ব্যস্ত, মার্কেট রক্ষা করতে ফায়ার সার্ভিস অতটা ব্যস্ত নয়। এমন কথা মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। এসময় বিক্ষুব্ধ কিছু ব্যবসায়ী ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের ভেতরে ঢুকে এবং বাইর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। তখন সকাল ৯টার মতো বাজে। ইটপাটকেলের আঘাতে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ভবনটির দরজা-জানালার কাচ ভেঙে পড়ে। মূল্যবান আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বিক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আপনাদের জন্যই জীবন দিচ্ছি। তাহলে কেন আমাদের ওপর আঘাত করছেন। এতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা মনোবল হারাতে পারেন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, আপনাদের রক্ষা করতে গিয়ে গত বছর আমাদের ১৩ জন সহকর্মীর প্রাণ গেছে। ২৯ জন আহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতির পর ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আগুনে পুড়ে যাওয়া মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বলে আমরা ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল ব্যানার টাঙিয়ে দিয়েছিলাম। এ সংক্রান্ত অন্তত ১০ বার নোটিশ করা হয়েছে মার্কেট কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের। তারপরও সেখানে ব্যবসা চলছিল। মূলত মার্কেটটি দেখভাল করার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ)।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিদের দাবি, সাতটি মার্কেটের অন্তত ৫ হাজার দোকান পুড়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার মালামাল। তার চেয়ে বেশিও হতে পারে। এ ছাড়া আগুন নেভানোর জন্য পানি ছিটানোর কারণে বহু ভালো মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। যেগুলো আর বিক্রির উপযুক্ত নেই। মার্কেটজুড়ে কান্নার রোল পড়ে গেছে। বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়বেন। প্রায় শতভাগ দোকানে ঈদকে সামনে রেখে প্রচুর টাকার মালামাল তুলেছিলেন। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন। কারণ এসব মার্কেটের অধিকাংশ দোকানের কোনো ইন্স্যুরেন্স করা নেই।
দুপুর দেড়টার দিকে সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, ডিএমপি কমিশনার পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক, পুলিশের বিশেষ শাখাপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলামসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। বেলা তিনটায় পুলিশ মহাপরিদর্শক আনুষ্ঠানিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি কোনো নাশকতা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হবে। পুলিশের ৫টি ওয়াটার ক্যানন রাজারবাগ থেকে এনে অগ্নিনির্বাপণের জন্য কাজে লাগানো হয়। এছাড়া আমাদের ওয়াটার রিজার্ভার থেকে প্রায় দুই লাখ লিটার পানি অগ্নিনির্বাপণের জন্য ব্যয় হয়েছে। পুলিশের দুই হাজার ফোর্স কাজ করেছে। আসাদের সব সদস্য মার্কেট লাগোয়া ব্যারাক থেকে বেরুতে পারলেও কোনো ধরনের মালামাল বের করা সম্ভব হয়নি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। পুলিশের তরফ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি পুরো বিষয়টি নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাশকতা, তা খতিয়ে দেখবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহত ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের মধ্যে একজনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, বার্ন ইউনিটে দুইজন দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে একজন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী। অপরজন ব্যবসায়ী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। সন্ধ্যা ৬টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বলছে, অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষতি, উদ্ধারসহ অন্য বিষয়াদি তদন্তসাপেক্ষে বলা যাবে। সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি। তবে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ফায়ার সার্ভিসের মোট ৪৮টি ইউনিট কাজ করেছে। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদও সম্পূর্ণরূপে অগ্নিনির্বাপণের কাজ চলছিল।
কমেন্ট বক্স