সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

ভোটের পথে পাকিস্তান

  • আপলোড তারিখঃ ০৪-০৪-২০২২ ইং
ভোটের পথে পাকিস্তান


অনাস্থা নাকট * সংসদ বাতিল ঘোষণা * ৩ মাসের মধ্যে নির্বাচন * উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ

সমীকরণ প্রতিবেদন:
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি দেশটির জাতীয় পরিষদ তথা ন্যাশনাল পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব পার্লামেন্টে নাকচ হওয়ার পরই আইনসভা ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এরপরই পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট। একইসাথে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশটিতে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানানো হয়েছে। তবে এর প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলো উচ্চ আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো বলেছেন, প্রস্তাবের ওপর ভোট হতে না দিয়ে সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্ট ছেড়ে যাবে না। তাদের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে যাবেন বলেও তিনি জানান। অন্যদিকে সা¤প্রতিক রাজনৈতিক ইস্যুতে একটি চিঠি পাওয়ার পর গতকাল দেশটির প্রধান বিচারপতি এ বিষয়ে শুনানির জন্য শক্তিশালী একটি বেঞ্চ গঠনের কথা জানিয়েছেন। খবর ডন, জিও নিউজ, রয়টার্স ও আল জাজিরার। এর আগে গতকাল রোববার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব নাকচ করে পার্লামেন্ট। বিরোধী দলগুলোর অনাস্থা প্রস্তাব সংবিধানের পরিপন্থী জানিয়ে সেটিকে নাকচ করেন জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি।
পার্লামেন্টে এ সিদ্ধান্তের পরপরই এক ভাষণে ইমরান খান সবাইকে নতুন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহŸান জানিয়ে বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে অ্যাসেম্বলি ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ইমরান তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব নাকচ হওয়ায় নাগরিকদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ডেপুটি স্পিকার রোববার সরকার পরিবর্তন ও বিদেশী ষড়যন্ত্রের চেষ্টা নস্যাৎ করেছেন। অ্যাসেম্বলিগুলো ভেঙে দিতে আমি প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখেছি। কোনো দুর্নীতিবাজ শক্তি এই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারক হতে পারে না। অ্যাসেম্বলি বিলুপ্ত ঘোষিত হলে নির্বাচন ও তত্ত¡াবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, যারা গণতন্ত্র চায়, তাদের উচিত জনগণের কাছে যাওয়া। নির্বাচন হওয়া উচিত, যাতে জনগণই সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা কাকে সরকার হিসেবে চায়। গত কয়েক দিনে এমপি কেনাবেচায় শত শত কোটি রুপি ব্যয় হয়েছে, সব নষ্ট হয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্ট ভেঙে দিলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিতে হয়। নির্বাচন হবে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে। পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার পর প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সাথে আলোচনা করে তত্ত¡াবধায়ক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন। প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর পিটিআইয়ের নেতারাও আগামী ৯০ দিনে মধ্যে নতুন নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে টুইটে জানিয়েছেন। যদিও নাটকের এখনই শেষ নয় বলেও অনেকে মনে করছেন। বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টে গেলে সেখানকার সিদ্ধান্তও অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। আইনজীবী আসাদ রহিম খান মন্তব্য করেন, ‘ফের একবার পার্লামেন্টের ভবিষ্যৎ ঠিক করতে যাচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট।’
এদিকে গতকাল দুপুর থেকে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা ঘটতে থাকে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে। বিরোধী দলগুলো আকস্মিকভাবে স্পিকার আসাদ কায়সারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনলে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে আসেন ডেপুটি স্পিকার কাসিম খান সুরি। অধিবেশন শুরুর কিছুক্ষণ পর ফ্লোর নিয়ে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী সেদেশের সংবিধানের ৫ ধারার কথা উল্লেখ করে বলেন, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে সব নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৭ মার্চ আমাদের একজন রাষ্ট্রদূতকে অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিদের সাথে এক সভায় ডেকে নিয়ে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হবে বলে জানানো হয়। এর এক দিন পর পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। বিদেশী শক্তির ইশারায় এমন প্রস্তাবের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। আমি স্পিকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আহŸান জানাই। এরপর ডেপুটি স্পিকার সুরি ৮ মার্চ অনাস্থা প্রস্তাব দাখিলের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, কোনো বিদেশী শক্তিকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটাতে দেয়া উচিত নয়। বিদেশী শক্তির ইশারায় অনাস্থা প্রস্তাব আনার যে অভিযোগ মন্ত্রী করেছেন, সেটা সঠিক। অনাস্থা প্রস্তাবটি আইন, সংবিধান ও কার্যবিধির পরিপন্থী মন্তব্য করে তিনি সেটি নাকচ ঘোষণা করেন।
আদালতে যাবেন বিরোধীরা
পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ার পর দেশটির বিরোধীদলীয় নেতারা বলছেন, তারা এখন আদালতের দ্বারস্থ হবেন। পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া, অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর করা আইনসম্মত কি না, এ ব্যাপারে পাকিস্তানের আইন বিশেষজ্ঞ সারুপ ইজাজ বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এই পদক্ষেপ সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতিরও লঙ্ঘন। তিনি বলেন, ‘যখন অনাস্থা প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয় এবং অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে বলেছেন যে ভোট হবে, তখন এই পদক্ষেপ সাংবিধানিক বিধিবিধানের প্রতি অবজ্ঞা বলে মনে হয়।’ এই মুহূর্তে সঙ্কটের একমাত্র সমাধান সুপ্রিম কোর্ট দিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাকিস্তানের এই আইনবিশেষজ্ঞ বলেন, যদি পার্লামেন্টে কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে এবং এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়, তাহলে আদালত সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। আদালত যদি সিদ্ধান্ত নেন যে, এতে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে তাহলে সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার পরামর্শ বাতিল এবং অকার্যকর ঘোষণা করা হবে। এই আইনজীবী বলেন, আদালত যদি স্পিকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে অনাস্থা প্রস্তাব আবারও ভোটের জন্য তোলা হবে। সারুপ ইজাজ বলেন, আমার মতে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং একাধিকবার সেটি করেছেনও। যদিও আদালত পার্লামেন্টের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে নারাজ, তারপরও স্পিকার যদি সংবিধান উপেক্ষা করে থাকেন, তাহলে তিনিও দায়মুক্তি পেতে পারেন না। দেশটির অপর আইন বিশেষজ্ঞ মুনীব ফারুক প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার পরামর্শকে ‘সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া রীমা ওমর নামের অপর এক আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, কোনো যদি কিন্তু নয়, স্পিকারের নির্দেশনা পরিষ্কার অসাংবিধানিক।
অবস্থান কর্মসূচি বিরোধী দলগুলোর
প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট না হওয়া পর্যন্ত দেশটির পার্লামেন্টে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে বিরোধী দলগুলো। পিপিপি নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি গতকাল এক টুইটে এ বিষয়টি জানিয়েছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে বিষয়টি জানা গেছে। ইমরান খানের বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা ভোট বাতিলের পর, বিলাওয়াল জারদারি টুইটে বলেন, ‘সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, অনাস্থা প্রস্তাবে ভোট দেয়ার অনুমতি দেয়নি। তবে, ঐক্যবদ্ধ বিরোধী দল পার্লামেন্ট ছাড়ছেন না। আমাদের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছেন। আমরা সব প্রতিষ্ঠানকে পাকিস্তানের সংবিধান রক্ষা, সমুন্নত রাখা, রক্ষা ও বাস্তবায়নের আহŸান জানাচ্ছি।’ ওই টুইটে সংযুক্ত করে দেয়া এক ভিডিও ভাষণে বিলাওয়াল বলেন, বিশ্ব জানে, বিরোধীদের অনাস্থা ভোটে জেতার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। শেষ মুহূর্তে, স্পিকার একটি বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে পাকিস্তানের আইন ভঙ্গ করা হয়েছে। আইনি অধিকার ফিরে পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্টে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
‘সেনাবাহিনীর কিছুই করার নেই’
মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পট আমূল পাল্টে যাওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনী বলেছে, ‘আজ যা ঘটেছে তা নিয়ে সেনাবাহিনীর কিছুই করার নেই।’ গতকাল সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল বাবর ইফতিখার এই মন্তব্য করেছেন বলে জিও নিউজ জানিয়েছে। যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জেনারেল বাবর তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি দেশটির পার্লামেন্টের নি¤œকক্ষ জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেয়ার পর আইএসপিআরের মহাপরিচালক চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে এসব কথা বলেন।
পাঞ্জাবের গভর্নর বরখাস্ত
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর চৌধুরী সারওয়ারকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সরকার। এই তথ্য জানিয়েছে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। খবরে বলা হয়েছে, পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নরের পদ থেকে চৌধুরী সারওয়ারকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত রোববার সকালে কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী একটি টুইট বার্তায় ঘোষণা করেন। সে সময় ফাওয়াদ বলেন, পাঞ্জাবের নতুন গভর্নরের নাম পরে ঘোষণা করা হবে। তার ভাষায়, ‘তত দিন পর্যন্ত, সংবিধান অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার ভারপ্রাপ্ত গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’



কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী