সমীকরণ প্রতিবেদন:
অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে কিছু অস্বস্তিকর বিষয় রয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত ও সমুদ্রসীমার ইস্যুটি সুরাহা হওয়ার পরও দুই দেশ সম্পর্ক থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারছে না। সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যার সংখ্যা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে আছে। ভারতের সাথে যেকোনো পর্যায়ের আলোচনাতেই আমরা বিষয়টি তুলে ধরি। অভিন্ন নদীর পানি ন্যায্যবণ্টনের ইস্যুটি সুরাহা না হওয়া ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আর একটি বাধা। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তিস্তা নদী থেকে আরো বেশি পানি পেতে চায়। এ ছাড়া গোমতি, মুহুরী, মানু, খোয়াই, দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে আমরা একটি রূপরেখা চুক্তি চাই।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর গতকাল বুধবার আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহরিয়ার আলম এ সব কথা বলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটিজিক স্ট্যাডিজ (বিআইআইএসএস) এই সেমিনারের আয়োজন করে। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. অরবিন্দ গুপ্ত। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মুহাম্মদ মাকসুদুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেন।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিঘœহীন ট্রান্সপোর্ট কানেকটিভিটি স্থাপিত হলে বাংলাদেশের জাতীয় আয় ১৭ শতাংশ এবং ভারতের জাতীয় আয় আট শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপর একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ট্রান্সপোর্ট কানেকটিভিটি স্থাপনের পাশাপাশি দুই দেশ মুক্তি বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সই করলে ভারতে বাংলাদেশের রফতানি ২৯৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ভারতের রফতানি ১৭২ শতাংশ বাড়বে। তাই কানেকটিভিটি আমাদের দুই দেশের স্বার্থই সংরক্ষণ করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সাথে এফটিএ সই করেনি। শ্রীলঙ্কার সাথে এফটিএ নিয়ে আলোচনা অনেক দূর অগ্রসর হলেও তা শেষ পর্যন্ত সই হয়নি। তবে ভুটানের সাথে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) করেছে। এটি অন্যান্য দেশের সাথে এফটিএ সই করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে আস্থা জোগাবে। মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার কারণে ২০২৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ ইবিএর আওতায় শুল্ক ও কোটামুক্ত পণ্য রফতানির সুযোগ হারাবে। তাই এফটিএর ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।
শাহরিয়ার আলম বলেন, পর্যটনের জন্য বাংলাদেশীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ভারত। অনেক বাংলাদেশী ভারতে চিকিৎসা নিতে যান। ভারতে পর্যটন ও চিকিৎসাসেবা নেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। তাই সঙ্গতকারণেই বিশ্বে ভারতের সবচেয়ে বড় ভিসা সার্ভিস সেন্টারটি ঢাকায় অবস্থিত। অন্য দিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে হাজার হাজার ভারতীয় কাজ করছে। ভারতের রেমিট্যান্স আয়ের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার বাংলাদেশ। তাই আমরা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। আর এটা থেকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধটা আসে।
অরবিন্দ গুপ্ত বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে বিশ্বে অনন্য। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেনÑ এতে হাজার হাজার ভারতীয় সেনা প্রাণ দিয়েছে। যুুদ্ধে ভূমিকা রাখার জন্য ভারতীয়দের সম্মাননা দিয়েছে বাংলাদেশ। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। তিনি বলেন, গত এক দশকে স্থল সীমানা ও সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য বাধা দূর করার ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা ইস্যুতে সহযোগিতা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই আমাদের নিজ নিজ দেশের পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থকেও সমুন্নত রাখতে হবে। তিনি বলেন, ভারত আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিশ্বাস করে। তাই এই অঞ্চলের সবাইকে নিয়ে দিল্লি অগ্রসর হতে চায়। বর্তমান সরকার ‘প্রতিবেশী প্রথম’Ñ এই পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। আঞ্চলিক জোট সার্কে স্থবিরতা দেখা দিলেও বিমসটেক নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে।
পাকিস্তানের সাথে একাধিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভারতের প্রবীণ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) আর কে সানি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করতে পারাটা ভারতের জন্য সবচেয়ে গৌরবের বিষয়। আমাদের এই সম্পর্ক রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ। আজ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ সামাজিক-অর্থনৈতিক সবদিক দিয়েই এগিয়ে রয়েছে। অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উত্থাপন করেন বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির ও বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের কেন্দ্র প্রধান ড. শ্রীরাধা দত্ত। বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর রিজিওনাল স্ট্যাডিজের চেয়ারম্যান শামসুল আরিফিন, সাবেক মন্ত্রী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) হারুন-উর-রশিদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজসহ বিশিষ্টজনরা এতে বক্তব্য রাখেন।
সমীকরণ প্রতিবেদন