সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

জন্মসনদে আটকা পথশিশুদের ভাগ্য

  • আপলোড তারিখঃ ০২-০১-২০২২ ইং
জন্মসনদে আটকা পথশিশুদের ভাগ্য

অজানা পথে হাঁটছে রাসেল। ঠিকানা জানা নেই। জানা নেই জন্মপরিচয়ও। শুধু বলতে পারে, ছোটবেলায় মা হাইকোর্ট মাজারের সামনে তাকে ফেলে গেছে। এটাও অন্যের মুখে শুনেছে। সেই থেকে রাসেলের পরিচয় পথশিশু। দীর্ঘকাল মানবেতর জীবন পার করেই বেড়ে ওঠা। তবে আট মাস আগে পথশিশু সেবা সংগঠনের মাধ্যমে রাসেলের আশ্রয় হয় সাভারের ‘জে ডব্লিউ মায়ের কোল’ নামে একটি শেল্টার হোমে। সেখানে গিয়ে একপ্রকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচে রাসেল। স্বপ্ন দেখতে থাকে স্কুলে ভর্তি হওয়ার, বড় হওয়ার; স্বাভাবিক জীবন-যাপন করার। তবে রাসেলের বড় হওয়ার স্বপ্ন আটকে যায় জন্মসনদে। জন্মসনদ না থাকায় শেল্টার হোমে থেকেই শুরু হয় নানা জটিলতা। সনদের অভাবে এনজিওতে ঠাঁই পেয়েও স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি। বয়স ১২ বছর হওয়া সত্ত্বেও নিতে পারেনি করোনার টিকাও। ফলে জীবন গঠনের শুরুতেই থেমে যেতে হয় রাসেলকে।

রাসেল বলে, ‘শেল্টার হোমের অন্য শিশুরা যখন স্কুলে যায়, তখন আমার খুব খারাপ লাগে। আমারও স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে।’ শুধু রাসেলই নয়, জন্মের পর থেকেই মৌলিক সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত দেশের হাজারো পথশিশু। এ ভোগান্তির প্রধান কারণই জন্মসনদ। নিবন্ধন না থাকায় পাচ্ছে না অতি জরুরি করোনা ভাইরাসের টিকা। গত ৩১ অক্টোবর থেকে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা দেয়া শুরু করে সরকার। তবে টিকার আওতায় নেই করোনার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা পথশিশুরা। অনেকে স্কুলে অধ্যয়নরত থেকেও পাচ্ছে না টিকা। এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি শেল্টার হোমের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দুই বছর আগে জন্মসনদ ছাড়াই পথশিশুদের স্কুলে ভর্তি করা যেত। বিগত কয়েক বছরে  বিভিন্ন স্বোচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তায় জন্ম নিবন্ধন ছাড়া হাজার হাজার ছিন্নমূল শিশুকে ঢাকা শহর ও এর আশপাশের বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। এখানেই মূলত টিকা সমস্যাটা তৈরি হয়েছে।  ওই শিশুদের জন্মসনদ না থাকায় এখন তাদের টিকা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। ওইসব শিশু স্কুলে অধ্যয়নরত থাকা সত্ত্বেও সরকারের ঘোষিত শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না। এমনকি জন্মসনদ না থাকায় সুরক্ষা অ্যাপে টিকা নিবন্ধনও করতে পারছে না তারা।             

এদিকে পর্যায়ক্রমে সব নাগরিক টিকার আওতায় এলেও নগরীর বিভিন্ন বস্তি, রেলস্টেশন এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ানো  সুরক্ষাহীন পথশিশুদের টিকা দেয়ার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে অন্যান্য নাগরিক সুবিধার মতো করোনার টিকা থেকেও দূরে রয়েছে বিশাল এই জনগোষ্ঠী। এদিকে করোনা ভাইরাসের টিকা নিতে জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয় পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। জন্মসনদ ও এনআইডি ছাড়া টিকা নিবন্ধনের কোনো সুযোগ নেই। সুযোগ নেই টিকা গ্রহণেরও। ফলে পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন ও এনআইডি না থাকায় স্কুলে অধ্যয়নরত থেকেও টিকা নেয়ার সুযোগ না পাওয়ায় এটাকে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় বাধা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি এটি নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন বলেও মনে করছেন তারা। তাই দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা পথশিশুদের জন্মসনদ জটিলতা কাটাতে বিশেষ ও পৃথক নীতিমালার তাগিদ দেন তারা। এ বিষয়ে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতেও বলা হয়। এ ছাড়া করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থায় অতি দ্রুত পথশিশুদের টিকার আওতায় আনারও দাবি জানানো হয়।

এদিকে পরিচয়হীনদের জন্য ২০১৮ সালের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালায় সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও নিবন্ধন কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে ভুগছে পথশিশুরা। কাটছে না নিবন্ধন জটিলতা। নিবন্ধন বিধিমালায় পিতৃপরিচয়হীন, এতিম শিশুর জন্ম নিবন্ধন করা যাবে এমন বিধি উল্লেখ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের অনীহায় উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে সরকারি বিধিমালা। ফলে জন্মসনদে আটকে যাচ্ছে রাসেলের মতো লাখ লাখ পথশিশুর ভাগ্য। বিড়ম্বনায় পড়েছে পথশিশুদের আশ্রয়দাতা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও। মূলত সরকারের জন্ম নিবন্ধন আইনের নতুন কিছু বিধির কারণে পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকরী প্রতিকার মেলেনি। জটিলতা নিরসনে কেউ এগিয়েও আসেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো জটিলতার বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের নজরে আনলেও কাজের কাজ হয়নি। সংগঠনগুলোর জোরালো দাবির পরও আমলে নেয়া হচ্ছে না। ভাবা হচ্ছে না পথশিশুদের মৌলিক অধিকার নিয়ে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, সরকারি ভাতাসহ অনেক নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে ওরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিতৃ, মাতৃপরিচয়, ঠিকানা, ধর্ম নির্ধারণ ও ফি দিতে না পারায় সংশ্লিষ্টরা নিবন্ধন করতে আগ্রহ দেখায় না। এদিকে শুধু জন্মসনদই নয়, দীর্ঘদিনেও পথশিশুর সংজ্ঞা ও প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। দেশে পথশিশুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও সরকারিভাবে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। যার ফলে নিবন্ধনহীন শিশুদের অপরাধে যুক্ত হওয়ার প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। ঘটছে শিশু অপরাধ। পরিণত বয়সের অপরাধীরা পথশিশুদের ব্যবহার করে নানা অপরাধমূলক কাজকর্ম করিয়ে নিচ্ছে।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু যখন বুঝতে পারে তার কোনো জন্ম নিবন্ধন নেই, পরিচয় নেই, স্কুলের সার্টিফিকেট নেই— তখনই তার মধ্যে এক ধরনের দুঃসাহস ও অপরাধপ্রবণতা কাজ করে। যেহেতু জন্ম নিবন্ধন নেই। তার সম্পর্কে কোনো তথ্যও নেই। তাই সে থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ জায়গাটায় অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া তারা বলছেন, পথশিশুরা করোনা ভাইরাসের বাহক হিসেবে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে আছে। তাই তাদের বয়স বিবেচনা না করে বিশেষ ব্যবস্থায় পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বের সবাইকে টিকা দেয়া উচিত। অপরদিকে আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মীরা জানান, সংঘবদ্ধ চলাফেরা ও রাত যাপনের কারণে করোনা ভাইরাসের বাহক হিসেবে ঝুঁকির মধ্যে আছে পথশিশুরা। তাদের দ্রুতই টিকার আওতায় আনতে হবে। এখানে বয়স বিবেচনা করা যাবে না। না হলে সরকারের বিশাল টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। সুফল মিলবে না। তবে পথশিশুদের টিকা দিতে এ ক্ষেত্রে বড় বাধা তাদের জন্মসনদ। পথশিশুদের অনেকেই পিতৃপরিচয় জানেন না। এ জন্য তাদের জন্মসনদ হচ্ছে না। কিন্তু পিতৃ ও মাতৃ পরিচয় ছাড়া যে জন্মসনদ হবে না এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। নিবন্ধন ফরমে দ্রুত সংস্কার আনা উচিত। নিবন্ধন ফরমে নাম, পিতা-মাতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানার পাশাপাশি পথশিশুদের তথ্য সংবলিত কোনো ক্রম সময়ের দাবি। তবেই এই জটিলতা নিরসন হবে। তাদের দাবি, তথ্যের ঘাটতিতে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক জন্ম বা মৃত্যুর নিবন্ধন প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে যেসব তথ্যের ঘাটতি বা অসম্পূর্ণ থাকবে সেখানে ‘অপ্রাপ্য’ লিখে জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধন করতে হবে।

টিকা পাচ্ছে সবাই শুধু পাচ্ছে না পথশিশুরা

পর্যায়ক্রমে দেশের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা আছে সরকারের। প্রথমে প্রবাসী শ্রমিক, মেডিকেল শিক্ষার্থী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থী, পুলিশ এবং বিদেশ অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা টিকা পেয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে নিবন্ধনকারীর বয়সসীমা কমিয়ে ৩৫ বছর করা হয়। পরবর্তীতে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে জাতীয় পরিচয়পত্র আছে এমন সবাইকে টিকার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ ১২ বছরের উপরের সব সাধারণ শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে টিকা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে প্রায় ১০ লাখ পথশিশু। তাদের করোনা টিকার আওতায় আনতে সরকারের কোনো উদ্যোগই লক্ষ করা যায়নি। কবে নাগাদ পথশিশুদের টিকা দেয়া হবে সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের কাছে। স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না ১৮ সংগঠনের ৪০০ পথশিশু : পথশিশুদের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে যেসব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে তা দিতে পারছে না শেল্টার হোমগুলো। ফলে স্কুলেও ভর্তি হতে পারছে না তারা। স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে শিশুর টিকার কার্ড-স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যয়নপত্র, স্বাক্ষর ও সিলসহ প্যাড, মা-বাবার অনলাইন জন্ম নিবন্ধনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক। অথচ এগুলোর কোনোটাই দেয়া সম্ভব হচ্ছে না পথশিশুদের। করোন ভাইরাসের টিকা না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘ফোরাম অব এডুকেটর ফর স্ট্রিট চিলড্রেন’-এর অধিভুক্ত সংগঠনগুলো। এরমধ্যে রয়েছে— পথশিশু সেবা সংগঠন, মায়ের আঁচল, পথের ইশকুল, ইনসিডিন বাংলাদেশ, জুম বাংলাদেশ, একমাত্রা সোসাইটি, মজার ইশকুল, শিশু তরী, সাজেদা ফাউন্ডেশন, সুধা, লিডো, ফ্রি-ল্যান্স, লেট ফর লাইফ, টিকান শেল্টার, বারাকা ও জে ডব্লিউ মায়ের কোল। তাদের দেয়া তথ্যমতে, জন্মসনদ না থাকায় সংগঠনে আশ্রয় পাওয়া অন্তত ৪০০ শিশুর ভাগ্য ঝুলে আছে। তাদের স্কুলে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। শত চেষ্টার পরও শিশুদের স্কুলে ভর্তি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহায়তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছার অভাবে প্রতিকার মিলছে না।

এ বিষয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার জেনারেল মির্জা তারিক হিকমত জানান, নতুন নিয়মে যখন ২০০১ সাল ও তার পরে জন্ম নেয়া কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয় তাতে মা-বাবার জন্ম নিবন্ধনের নম্বর দিতে হয়। সে কারণে বর্তমানে কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধনের জন্য মা-বাবার জন্ম নিবন্ধন থাকাটা আবশ্যক। পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধনের জটিলতা নিরসনে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জে ডব্লিউ মায়ের কোলের প্রধান সমন্বয়ক মনির হোসেন বলেন, আসলে দুই বছর আগে জন্ম নিবন্ধন ছাড়াই আমরা অনায়াসে পথশিশুদের স্কুলে ভর্তি করতে পেরেছি। কিন্তু বর্তমানে জন্মসনদ ছাড়া স্কুলে ভর্তি করানো সম্ভব হচ্ছে না। শিশুদের শেল্টা হোমে এনেও আমরা নিরূপায় হয়ে যাচ্ছি। নিবন্ধনের ব্যবস্থা না করতে পারলে তাদের করোনা টিকাও দিতে পারব না। এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোরালো দাবির পরও সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মূলত সরকারের সদিচ্ছার অভাবে পথশিশুদের জন্মসনদ জটিলতা সমাধান হচ্ছে না। পথশিশুদের জন্মসনদ পাওয়া তাদের অধিকার। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পথের ইশকুলের প্রধান সমন্বয়ক উম্মে সালমা আক্তার উর্মি বলেন, ‘ভাইরাসের ব্যাপারে কোনো সচেতনতা বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা পথশিশুদের নেই। এমনকি কেউ তাদের এ নিয়ে সচেতনও করেনি। সরকারিভাবে তাদের পাশেও কেউ দাঁড়ায়নি। আসলে যারা মৌলিক অধিকারগুলোই ঠিকমতো পাচ্ছে না তাদের আবার করোনা টিকা পাওয়ার কথা ভাবা অবান্তর। সব সুবিধার প্রধান বাধা জন্মসনদ। তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে সরকারের কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়নি। টিকা তো দূরের কথা।

পথশিশুদের জন্মসনদ দিতে হাইকোর্টে রিটের প্রস্তুতি

ডিজিটাল জন্মসনদ পদ্ধতি সংস্কার ও পথশিশুদের জন্মসনদের আওতায় এনে করোনা টিকা নিশ্চিত করতে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আগামী জানুয়ারির শেষের দিকে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড ফর চিলড্রেনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল। রিটে পথশিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে তাদের জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে সেটা জানতে চাওয়া হবে।

ডিজিটাল নিবন্ধন পদ্ধতিই সনদের বাধা

দেশের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পথশিশুদের শিক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নে চেষ্টা চালাচ্ছে। সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে তারা নানা পদক্ষেপ নিলেও এগিয়ে আসছে না সরকার। পথশিশুদের অধিকারের বিষয়ে বরাবরই অনীহা দেখাচ্ছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-পরিদপ্তর। এদিকে পথশিশুদের শেল্টার হোম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জন্ম নিবন্ধন পদ্ধতি ডিজিটাল হওয়ায় পথশিশুদের নিবন্ধনে ব্যাপক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বছর দুয়েক আগে সংগঠন বা শেল্টার হোম ব্যক্তিগত ঠিকানা দিয়ে জন্ম নিবন্ধন করা যেত। ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ড কাউন্সিলররা সহযোগিতা করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন রেজিস্ট্রেশনে স্থায়ী ঠিকানা, মা-বাবার নাম ও তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আবশ্যক হওয়ায় নিবন্ধন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই পিছিয়ে পড়ছে পথশিশুরা। ভর্তি হতে পারছে না রেজিস্ট্রার্ড কোনো বিদ্যালয়ে। পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা থেকে শুরু করে এসএসসি ও এইচএসসি— কোনো পরীক্ষায়ই অংশ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের।

যেসব নাগরিক সেবা পাচ্ছে না পথশিশুরা

বর্তমানে দেশে ১৬টি মৌলিক সেবা পেতে জন্মসনদ অবশ্যই প্রয়োজন হয়। এগুলো হলো— শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিয়ের নিবন্ধন, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় নিয়োগ, ব্যাংক হিসাব খোলা, গ্যাস-পানি-টেলিফোন-বিদ্যুতের সংযোগ, ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর (টিআইএন), ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহন নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি ও রপ্তানি লাইসেন্স, ঠিকাদারি লাইসেন্স, জমির নিবন্ধন এবং বাড়ির নকশা অনুমোদন। ফলে একমাত্র জন্মসনদ না হওয়ায় সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা থেকে দূরে রয়েছে পথশিশুরা।

পথশিশুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা

দেশে সরকারিভাবে পথশিশুদের বিষয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন খণ্ডিত গবেষণা ও জরিপে পথশিশুদের সংখ্যার উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও ইউনিসেফের এক গবেষণা বলছে, দেশে বর্তমানে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে রয়েছে সাত লাখ পথশিশু। নতুন বছরের শুরুতে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৪ জনে। আর ২০২৪ সাল নাগাদ সংখ্যাটা হবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০। অপরদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ঢাকাতেই ছয় লাখ পথশিশু রয়েছে। সারা দেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখ। অথচ ক্রমবর্ধমান এ শিশুদের কল্যাণে নেই কোনো নীতিমালা। তবে পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য মতে,  তাদের ২০০৪ সালে বিবিএস জরিপে দেশে পথশিশুর সংখ্যা ছয় লাখ ৭৯ হাজারের কিছু বেশি। এরপর আনুষ্ঠানিক কোনো জরিপ হয়নি। 

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, ‘যেখানে একজন শিশুর খাদ্য ও বাসস্থানের কোনো নিশ্চয়তা নেই সেখানে জন্ম নিবন্ধন বা  জন্মসনদ ও করোনা টিকা তার কাছে একটি অকল্পনীয় বিষয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এই জন্মসনদ না থাকার কারণেও শিক্ষাসহ অন্যান্য অনেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পথশিশুরা। পথশিশুরাও এ দেশের নাগরিক। সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত দেশের সব নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকে পথশিশুরা কেন বঞ্চিত হবে? কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সনদ সমস্যা সমাধান না হলে যুগ যুগেও তারা টিকা পাবে না। এটি জাতিসংঘের শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন।’  এদিকে শুধু পিতৃ-মাতৃ পরিচয় নয়, পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধনের ফিও একটি বড় বাধা বলে মনে করেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড ফর চিলড্রেনের নির্বাহী পরিচালক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়ে পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে যেমন তাদের প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে। এমনকি করোনা টিকার আওতায়ও আনা যাবে। তেমনি পর্যায়ক্রমে তাদের পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা যাবে। সরকারের অবশ্যই এ বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দেয়া উচিত।’ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মতো পথশিশুদেরও করোনা টিকা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কারণ তারা তো এ দেশেই জন্মেছে। দেশে সবার জন্য জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু এখনো এ নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে দেশের সুবিধাবঞ্চিত বৃহৎ জনগোষ্ঠী। আর নানা জটিলতায় জন্মসনদ নিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অভিভাবকসহ তাদের ওপর।’



কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী