সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

'আস্থা'র নিয়োগে অনাস্থা, হাতে গোনা ছাড়া কেউ পায়নি বেতন!

  • আপলোড তারিখঃ ২৯-১২-২০২১ ইং
'আস্থা'র নিয়োগে অনাস্থা, হাতে গোনা ছাড়া কেউ পায়নি বেতন!

অভিনব নিয়োগপত্র; সিভিল সার্জনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে যোগদানের নির্দেশনা : সন্দেহের নিশানা জেলার স্বাস্থবিভাগের প্রধানের দিকেই

রুদ্র রাসেল:
আস্থা প্রকল্প নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গোল্ডেন সার্ভিসের আওতায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালসহ জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে দুইশ’র অধিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর নিয়োগকৃতদের নামসহ পদবী দিয়ে যোগদানের জন্য নির্দেশও দিয়েছেন স্বয়ং জেলার সিভিল সার্জন। এই প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালেই নিয়োগ পেয়েছেন একশ জন। তবে এই একশ জনের নিয়োগের বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) বরাবর কোনো চিঠি প্রেরণ করেননি তিনি। সদর হাসপাতালে নিয়োগপ্রাপ্তরা জেলা সিভিল সার্জন অফিস থেকে আস্থা প্রকল্পের নিয়োগপত্র নিয়ে সরাসরি হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কাজও করছেন। তবে এই নিয়োগ নিয়ে গত কয়েকমাস ধরেই জেলা সদর হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতনমহলের অনেকেই দাবি করছেন এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণই ভূয়া। আসলে এই প্রকল্প দেখিয়ে যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার আড়ালে মূলত কোটি টাকার বানিজ্য চলেছে। এমন দুটি নিয়োগ বানিজ্যের প্রমাণও মিলেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদেরকে প্রতিমাসে তাঁদের বেতনের টাকা রকেট ও নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেওয়ার কথা থাকলেও গত দুইমাসে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মী শুধু একমাসের করে বেতন পেয়েছেন। অন্যরা এখন পর্যন্ত একটি টাকাও পাননি। এদিকে, আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেড দুইশতাধিক কর্মীকে সিভিল সার্জন অফিসের মাধ্যমে জেলা স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ দিলেও সিভিল সার্জন নিজেই এই প্রকল্প সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যে তিনি এই প্রকল্প সম্পর্কে খোঁজ নিতে পারেননি বলেও জানান। অথচ সিভিল সার্জনের মাধ্যমেই এই কর্মীরদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।


জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গায় গোল্ডেন সার্ভিসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে সদর হাসপাতালে ১০০ জন, জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৪ জন, দামুড়হুদা উপজেলা চিৎলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জন, আলমডাঙ্গা উপজেলা হারদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৮ জন, এছাড়ারও বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে আরও ২০ জনসহ ২০০ জনের অধিক আস্থা প্রকল্পের নিয়োগ পেয়ে কাজে করছেন। খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, নিয়োগের পরে দুইমাস পার হয়ে গেলেও সদর হাসপাতালের হাতেগোনা দু-চারজন একমাসের বেতন পেলেও অন্যরা এখন পর্যন্ত একটি টাকাও পাননি।


এদিকে, নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়োগপত্রে তাঁদের মাসিক বেতন বা পারিশ্রমিক কত টাকা দেওয়া হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট অংকের কথা লেখা না থাকলেও প্রতিমাসের বেতন মাসের ১ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে দেওয়া হবে বলে উল্লেখ আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হাতেগোনা দু-চারজন দুই মাস পার হওয়ার পরে ১ মাসের বেতন পেয়েছেন। আর যারা কোনো বেতনই পাননি কোম্পানি থেকে জানানো হয়েছে, একসঙ্গে নাকি তাদের তিনমাসের বেতন দেওয়া হবে। আদৌও এই কর্মীরা তাদের বেতন পাবেন কিনা সে সম্পর্কে নিয়োগপ্রাপ্তরাই ধন্দে আছেন।


এরই মধ্যে জেলাজুড়ে আস্থা প্রকল্পের গোল্ডেন সার্ভিস নিয়ে মানুষের মনে নানা সন্দেহ দানা বেঁধেছে। বিষয়টি সচেতনমহলের নজরে পড়লে তাঁরা নানা প্রশ্ন তোলেন জেলা সিভিল সার্জনের দিকে। সচেতনমহলের ধারণা এই প্রকল্পটি জেলায় কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করে অচিরেই নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। এই প্রকল্পে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রত্যেকেই টাকা দিয়েই নিয়োগ নিয়েছেন। তবে টাকা দিয়ে নিয়োগ নেওয়ার কথা প্রকাশ করলে চাকরি যাওয়ার ভয়ে মুখ খুলছেন না কেউ।


এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে জেলা সদর হাসপাতালেই গোল্ডেন সার্ভিসের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন ১০০ জনের অধিক। এরমধ্যে ৭২ জনের নিয়োগের বিষয়ে নিশ্চিত করেছে জেলা সিভিল সার্জন অফিস। বাকী ২৮ জনের বিষয়ে কোন তথ্য নেই সিভিল সার্জন অফিসে। তবে তারাও এখন পর্যন্ত সদর হাসপাতালেই কাজ করছেন। এরমধ্যে আবার ভূয়া কাগজপত্র ও টাকার বিনিময়ে নিয়োগের বিষয়ে জানতে পেরে সিভিল সার্জন দুই থেকে তিনজনকে হাসপাতাল থেকে বের করেও দিয়েছেন বলেও জানা যায়। তবে এ জেলায় মোট কতজনকে আস্থা প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার সঠিক তথ্য সিভিল সার্জনের হিসেবের মধ্যেই নেই।


কয়েকটি সূত্র দাবী করছে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় আস্থা প্রকল্পের গোল্ডেন সার্ভিসে যে ২০০ জন নিয়োগ পেয়েছেন, তার প্রত্যেকেই অন্তত এক লাখ টাকা করে দিয়েছেন। সেই হিসাব অনুযায়ী যদি এই নিয়োগে ২০০ জনের নিকট থেকে এক লাখ টাকা করে নেওয়া হয় তবে মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়াই ২ কোটিতে। এদের মধ্যে নয় থেকে দশ জনকে নয় ধেতে দশ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়া হয়েছে, সে হিসেবে সংগৃহিত টাকার তুলতায় একেবারেই নগন্য। এদিকে এতবড় একটা বিষয় জেলা সিভিল সার্জনের ভাবনার মধ্যে না থাকাটা মানুষের মনে আরও বড় সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। তবে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধানকে এমন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পূর্বে যাচাই-বাছাই করা জরুরি ছিল বলে সচেতনমহল মনে করেন।


যেহেতু সিভিল সার্জনের মাধ্যমে সদর হাসপাতাল বা জেলার অন্য সব উপজেলা স্বস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগপ্রাপ্তরা তাদের যোগদান সম্পন্ন করেছেন। তাই অনেকেই এটাকে ভূয়া ভাবতে পারেননি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান কর্মকর্তাকে ভরসা করেই হয়তো অনেকে গোপনে টাকা দিয়ে নিয়োগ নিয়েছেন। আর নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের মধ্যে কয়েকজনকে একমাসের বেতনবাবদ ৯-১০ হাজার টাকা করে দেওয়াও আস্থা প্রকল্পের ওপর ভরসা করানোর একটি কৌশল বলেও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল এলাকায় নিয়মিত আলোচনা সমালচনা মাঝে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন জেলা সিভিল সার্জনের দিকে। ধারণা করছেন জেলা সিভিল সার্জন নিজেই হয়তো এই আস্থা প্রকল্পের গোল্ডেন সার্ভিসের নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত জেলা সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত থাকার নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাপসাতালে আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সাভির্সের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম বলেন, ‘সিভিল সার্জন অফিসের মাধ্যমে সিভিল সার্জন স্যারের নির্দেশে আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সার্ভিসে নিয়োগ প্রাপ্তরা হপসাতালে কাজ করছে। আস্থা প্রকল্পের এই নিয়োগকৃত কর্মীদেরকে হসপাতালে নিয়োগের বিষয়ে সিভিল সার্জন স্যারের নিকট থেকে আমি কোন চিঠি পাইনি।


আস্থা প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ প্রকল্প সর্ম্পকে আমার খুব বেশি জানা শোনা নেয়। প্রকল্পটি আদৌ সঠিক কিনা সেটাও আমি নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের সঙ্গে আস্থা প্রকল্পের কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেছে। সিভিল সার্জন অফিস থেকে যাদেরকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে তারা কাজ করলেও আমরা তাঁদেরকে সম্পূর্ণরুপে কাজে লাগাতে পারছি না। সিভিল সার্জনের মাধ্যমে এই নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরা সরাসরি আস্থা প্রকল্পের আওতায় গোল্ডেন সার্ভিসের নিয়োগকৃত ওয়ার্ড মাস্টারের নিকট যোগাযোগ করছে। তার নির্দেশেই তারা হাপসাতালের বিভিন্ন স্টেক্টরে কাজ করছে।’
আস্থা প্রকল্পের বিষয়ে ও এই জনবল নিয়োগের সম্পর্কে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মারুফ হাসান জানান, ‘আস্থা প্রকল্পের কারও সঙ্গে তাঁর সরাসরি সাক্ষাৎ নাহলেও মোবাইলফোনের মাধ্যমে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে। তবে আস্থা প্রকল্পের গোল্ডেন সার্ভিসের নামে সদর হাপসাতালে যে জনবল দেওয়া হয়েছে আদৌও কোনো সঠিক প্রকল্প কিনা করোনা মহামারির সংকটের মধ্যে ও বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।’


এসময় সিভিল সার্জন প্রতিবেদককে গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ হাসানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একটি মোবাইল নাম্বর দেন। এই নাম্বারটিই আস্থা প্রকল্পের গোল্ডেন সার্ভিস লিমিটেডের সকল কাগজ ও চিঠিতে আছে বলেও তিনি জানান। তবে, পরিচালক জাহিদ হাসানের সঙ্গে কয়েকদিন যাবত কথা বলার চেষ্টা করা হলেও নাম্বরটি একটানা বন্ধ পাওয়ায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। (চলবে..)



কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী