ছবির ক্যাপশন:
আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে, আমদানি বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা কাটছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানির অভাবে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
গত পাঁচ বছরে তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ১০টি প্রকল্প বাতিল, প্রত্যাহার কিংবা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই আটকে রয়েছে। এসব স্থগিত প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট। অন্য দিকে, ২০১৮-১৯ সালে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালুর পর তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগও দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা থাকলেও গ্যাস সরবরাহের বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে দু’টি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর সুযোগ থাকলেও পেট্রোবাংলা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদার মাত্র ৩৯ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগের এই সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক চাপ। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ছিল আট হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে ভর্তুকি বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। গ্যাস সরবরাহের প্রকৃত ব্যয় ও বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানও ক্রমেই বাড়ছে। ডলারের সঙ্কট, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) নভেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত ‘এলএনজি-টু-পাওয়ার ইন এমার্জিং এশিয়া: ফাইভ ইয়ার্স অব প্রজেক্ট আউটকামস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের এই দুর্বল চিত্র উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির গবেষক স্যাম রেনল্ডস ও ক্রিস্টোফার ডলম্যান যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করেছেন।
আমদানি বাড়ছে, প্রকল্প আটকে আছে:
আইইইএফএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি ছিল ৪৪ লাখ ৩০ হাজার টন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ লাখ ৩০ হাজার টনে। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। অথচ একই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়েনি; বরং ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ হারে কমেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অংশ নেমে এসেছে ৪৪ দশমিক ১ শতাংশে। অথচ একসময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি ছিল দেশীয় গ্যাস। ২০২১ সালের পর বাংলাদেশে মোট এক হাজার ৯০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ আনুমানিক১৮০ কোটি ডলার। বিপরীতে, ১০টি প্রকল্প বাতিল, প্রত্যাহার কিংবা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই পড়ে রয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা আট হাজার মেগাওয়াট এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭৭০ কোটি ডলার।
২০২২ সালে পায়রা বন্দরে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি থেকেও সরকার সরে আসে। অর্থাৎ পরিকল্পিত সক্ষমতা ও বাস্তবায়িত সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় টার্মিনাল অবকাঠামো নির্মাণেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ২০১৮-১৯ সালে দু’টি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) চালুর পর তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ আর বাস্তব রূপ পায়নি।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার সামিট ও এক্সিলারেটরের সাথে দু’টি এফএসআরইউ নির্মাণের চুক্তি বাতিল করে। একই সময়ে দৈনিক ৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন সক্ষমতার একটি টার্মিনালের দরপত্রও বাতিল করা হয়। আইইইএফএর হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ছয়টি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা ৩৮ এমটিপিএর বেশি।
৭ বছরের দীর্ঘসূত্রতা:
এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনার আরেকটি বড় দুর্বলতা। চালু হওয়া তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও প্রাক্-নির্মাণ কার্যক্রম শুরু থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে গড়ে সাড়ে সাত বছর সময় লেগেছে। এর একটি উদাহরণ রিলায়ান্স মেঘনাঘাটের ৭১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০১৬ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় এবং ২০১৯ সালে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালেও প্রকল্পটির কাজ ৭০ শতাংশের কম সম্পন্ন হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চে নির্মাণকাজ শেষ হলেও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পুনর্র্নিধারণ এবং গ্যাসসঙ্কটের কারণে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারেনি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি চালুর দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সঙ্কটে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্তও জ্বালানি ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ, পাইপলাইন, আমদানি অবকাঠামো এবং অর্থায়নের নিশ্চয়তা না থাকলে নতুন কেন্দ্রও কার্যত অকার্যকর সম্পদে পরিণত হতে পারে।
ভর্তুকির পাহাড়, বাড়ছে আর্থিক চাপ:
গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য ঐতিহাসিকভাবে সরবরাহ ব্যয়ের তুলনায় কম রাখার কারণে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ওপর ভর্তুকির চাপ ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাতের জন্য পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহ ব্যয় নির্ধারিত দামের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি ছিল। অথচ গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৪৮ শতাংশ।
অন্য দিকে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিপিডিবির গড় বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় ইউনিটপ্রতি ছয় টাকা থেকে বেড়ে ১২ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গড় বিক্রয়মূল্য পাঁচ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে সাত টাকা ১০ পয়সা। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ টাকা। এই ব্যবধানের প্রতিফলন পড়েছে সরকারের ভর্তুকিতে। ২০১৯ সালে বিপিডিবির বার্ষিক ভর্তুকি ছিল আট হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ ছয় বছরে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে।
এদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পেট্রোবাংলার পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ১৬ হাজার কোটি টাকাই বিপিডিবির কাছে বকেয়া। ফলে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার আর্থিক শৃঙ্খলও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ডলার সঙ্কট ও ঋণনির্ভরতা:
এলএনজি আমদানির অর্থ জোগাতে বাংলাদেশ ২০২২ সাল থেকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। আইইইএফএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৫৫০ কোটি ডলারের কর্মসূচি, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়ন এবং বিশ^ব্যাংকের ঋণসুবিধা জ্বালানি আমদানির অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরে এআইআইবির অর্থায়ন ৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া বিশ^ব্যাংকের বার্ষিক ৩৫ কোটি ডলারের ঋণসুবিধা ২০২৬ সালের মে মাসে দ্বিগুণ করা হয়েছে বলে এতে উল্লেখ রয়েছে। তবে ঋণনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি দেশের ঋণমান ও বৈদেশিক অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফিচ ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক করে। এর ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ সংগ্রহের ব্যয় বাড়তে পারে এবং নতুন অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামও বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ২৭ দশমিক ৫ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় আরো বেড়েছে।
