আন্দোলনের আড়ালে ষড়যন্ত্র

আপলোড তারিখঃ 2026-11-02 ইং
আন্দোলনের আড়ালে ষড়যন্ত্র ছবির ক্যাপশন:

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ চার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করেছে। গতকাল রোববার রাজধানীর মিরপুর, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে নতুন করে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গাজীপুরে কারখানার গুদাম পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে আন্দোলকারীরা। এদিকে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠায় সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের ৫০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।


অন্যদিকে মিরপুরে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর বাহিনীটি ২৮ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, আটকরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। এদিকে বিজিএমইএ জানিয়েছে, চলমান আন্দোলনে একদিনে প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া ও দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সরকার ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চললেও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্ত না আসায় অসন্তোষ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতারা।


অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বেতনা-ভাতা নিয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষকে পুঁজি করে নাশকতার নীলনকশা আঁকছে পতিত আওয়ামী লীগ। দলটি ডিসেম্বরে বড় নাশকতার পরিকল্পনা করছে। তার অংশ হিসেবে শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরি করছে। এরই মধ্যে শ্রমিকদের ভেতর ঢুকে রাজধানী ও গাজীপুরে তারা সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কারখানা ভাঙচুর, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ সন্ত্রাসী কর্মাকাণ্ড চালানো হচ্ছে।


এদিকে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি চূড়ান্ত চূড়ান্ত করা করা হয়েছে। হয়েছে। গতকাল এ নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান এই বোর্ডের প্রধান। এছাড়া এই বোর্ডের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হলেন পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন ও বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব, আইয়ুব, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বিজিআইডব্লিউএফের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন।


নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ডে আছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। তৎপরতা বাড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। এদিকে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র তৎপর হয়ে উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো। এই আন্দোলনে দলটির নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ, সংঘর্ষে উসকানি ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।


পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের এই তৎপরতার সমন্বয় করছেন ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের এনে আন্দোলনে যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।


ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান ২৮ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানান। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার কক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মী। তাদের মধ্যে দুজনের নাম রাকিব ও আরিফ বলে জানা গেছে। বাকিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ডিবির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, আলিফ মোল্লাহ বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে শতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতির তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। আটক ব্যক্তিরা নাশকতার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানায় পুলিশ।


মিরপুরের শ্রমিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের পদধারী নেতার অংশগ্রহণের তথ্যও সামনে এসেছে। তার নাম সাজবুল ইসলাম। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানও শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। গতকাল গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি দাবি করেন, গার্মেন্টসকর্মী পরিচয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে নেমেছেন। মিরপুরে ছাত্রলীগ নেতা সাজবুল ইসলাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, আন্দোলনকে উসকে দিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে এ ধরনের আরও আন্দোলন গড়ে তোলার অপচেষ্টা চলছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার পোস্টে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধেও আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।


৫০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা:
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। এছাড়া গাজীপুরেও শতাধিক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শিল্প পুলিশ-১ এর আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া রোববার বিকালে বলেন, ‘সকাল থেকে শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭টি তৈরি পোশক কারাখানা আজকের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।’


শিল্প পুলিশ-২ এর গাজীপুরের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, রোববার ববার সারা সারা দিনে দিনে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে বিজিএমইএ জানিয়েছে, আন্দোলনের মুখে অন্তত ৫০০টি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের মধ্যে গতকাল দুপুরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার উপজেলার চন্দ্রা চন্দ্রা পল্লী পল্লী বিদ্যুৎ বিদ্যুৎ এলাকায় একটি কারখানার গুদাম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।


গাজীপুরে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন:
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুর শিল্প পুলিশের সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, আপাতত পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজনে প্লাটুন সংখ্যা বাড়তে পারে। আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল না-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে তারা দায়িত্ব পালন করবেন বলেন জানান তিনি। তিনি বলেন, গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মৌচাক, নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।


কারখানার গুদাম, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি কারখানার গুদাম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও আটকে দেন আন্দোলনকারীরা। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ব্যাহত হয়। গতকাল বেলা ১২টার দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন কালিয়াকৈর ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম।
পরিস্থিতি খারাপ হলে কারখানা বন্ধ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন মালিকরা। এমনটাই জানিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলন এবং বিভিন্ন কারখানায় অস্থিরতার মধ্যে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এ বক্তব্য এলো।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)