জীবননগর যাদবপুরে মাদ্রাসার নামে সরকারি বরাদ্দ ও অনুদান নিয়ে প্রশ্ন

সাইনবোর্ডে মাদ্রাসা, ভেতরে নেই শিক্ষা কার্যক্রম!

ব্যক্তিগত জমিতে নির্মাণাধীন ভবন, শিক্ষার্থী ও আয়-ব্যয়ের নথি নিয়ে অস্পষ্টতা

আপলোড তারিখঃ 2026-10-28 ইং
জীবননগর যাদবপুরে মাদ্রাসার নামে সরকারি বরাদ্দ ও অনুদান নিয়ে প্রশ্ন ছবির ক্যাপশন:

গ্রামের সড়ক থেকে চোখে পড়ে একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা ‘দারুল উলুম ইসলামিয়া নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও লিল্লাহি বোর্ডিং’। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয় বহনকারী এই সাইনবোর্ড দেখে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে নেই চোখে পড়ার মতো শিক্ষা কার্যক্রম। বরং নির্মাণাধীন একটি দ্বিতল ভবনের পাশে টিনশেড ঘরে বসবাস করছেন মাদ্রাসার পরিচালক মাসুদুর রহমান ও তাঁর পরিবার।


চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের যাদবপুর গ্রামের এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এখন উঠেছে নানা প্রশ্ন। মাদ্রাসার নামে সরকারি বরাদ্দ এসেছে, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ ও নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। অথচ সরেজমিনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়নি।


স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসার নামে সংগ্রহ করা অর্থ ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত জমিতে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এই ভবন নির্মাণে সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যয় হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির নামে পাওয়া সরকারি সহায়তা ও ব্যক্তিগত অনুদানের অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় হয়েছে- তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে মাসুদুর রহমান যাদবপুর দারুল উলুম ইসলামিয়া নূরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও লিল্লাহি বোর্ডিং প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির নামে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদ থেকে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জীবননগর উপজেলা পরিষদ থেকে এক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।


সরকারি সহায়তা পাওয়ার তথ্য থাকলেও এসব অর্থ ও চাল কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট হিসাব সামনে আসেনি। বরাদ্দের অর্থে কী কাজ হয়েছে, চাল কারা পেয়েছেন কিংবা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রয়োজন নথিপত্র যাচাই।


চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র জানিয়েছেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন মাদ্রাসায় সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সাধারণত জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয় ব্যক্তিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুদান দেওয়া হয়। তবে এই প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া কী ছিল, কোন আবেদনের ভিত্তিতে অর্থ অনুমোদন করা হয়েছে এবং বরাদ্দের শর্ত কী ছিল- এসব তথ্য যাচাই করা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।


সরেজমিনে দেখা যায়, মাদ্রাসার পরিচালক মাসুদুর রহমান নিজের জমিতে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করছেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবনের নিচতলায় পরিবারের বসবাসের ব্যবস্থা থাকবে এবং ওপরতলায় পরিচালিত হবে মাদ্রাসার কার্যক্রম। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ অর্থ, রড ও সিমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব সহায়তা মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য দেওয়া হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো শর্তে- তা জানতে সহায়তাদাতাদের বক্তব্য ও অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। এখানেই দেখা দিয়েছে মূল প্রশ্ন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে সংগৃহীত অর্থ ও নির্মাণসামগ্রী কী উদ্দেশ্যে ব্যয় হচ্ছে? ভবনটি যদি একই সঙ্গে পরিচালকের পারিবারিক আবাসন ও মাদ্রাসার কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে দুই ধরনের ব্যবহারের মধ্যে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?


২০-২৫ শিক্ষার্থীর দাবি, নেই হাজিরা খাতা:
মাদ্রাসার পরিচালক মাসুদুর রহমানের দাবি, তাঁর প্রতিষ্ঠানে ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক রয়েছেন দুজন, যাঁদের একজন তিনি নিজেই। কিন্তু সরেজমিনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি যে তথ্য দিয়েছেন, তা যাচাই করার মতো হাজিরা খাতা বা সংশ্লিষ্ট কোনো নথি দেখাতে পারেননি। দ্বিতীয় শিক্ষকের উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি।


মাসুদুর রহমানের ভাষ্য, ভবন নির্মাণের কাজ চলায় গত তিন মাস ধরে শিক্ষার্থীরা ছুটিতে রয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে আবার পড়াশোনা শুরু হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রম কবে থেকে বন্ধ, শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন এবং অভিভাবকদের এ বিষয়ে কীভাবে জানানো হয়েছে- এসব প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাদ্রাসাটিতে নিয়মিত পাঠদান তাঁদের চোখে পড়ে না। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও তেমন দেখা যায় না। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক ও শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে গ্রামের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই।


আয়-ব্যয়ের হিসাব ও পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন:
একটি প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি বরাদ্দ কিংবা ব্যক্তিগত অনুদান গ্রহণ করা হলে সেই অর্থের উৎস, পরিমাণ ও ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুদানের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, কতজন শিক্ষার্থী সুবিধা পেয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে কী কার্যক্রম পরিচালনা করছে- এসব তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এই মাদ্রাসার আয়-ব্যয়ের হিসাব কোনো রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি বরাদ্দ, চাল এবং ব্যক্তিগত সহায়তার অর্থ ও সামগ্রী কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা নির্ধারণে নথিপত্র যাচাই জরুরি।


তদন্তের দাবি স্থানীয়দের:
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাদ্রাসাটির নামে সরকারি বরাদ্দ ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া সহায়তার ব্যবহার তদন্ত করা হোক। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বাস্তব শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরিচালনা কমিটি এবং আর্থিক হিসাব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাঁদের মতে, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে সহায়তা সংগ্রহ করা হলে সেই অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা থাকা দরকার। অনুদানদাতাদের উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থে উপকৃত হচ্ছে কি না এবং সরকারি অর্থ বরাদ্দের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না- এসব বিষয় নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।


যাদবপুরের এই মাদ্রাসাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে এখন প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত। সরকারি বরাদ্দের নথি, অর্থ ও চাল বিতরণের হিসাব, নির্মাণকাজের ব্যয় এবং শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র একসঙ্গে যাচাই করলেই বোঝা যাবে, প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না। অভিযোগ উঠেছে, প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে- সাইনবোর্ডের আড়ালে থাকা বাস্তবতা কী।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)