ছবির ক্যাপশন:
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনি। লাল সিঁদুরে রাঙা মুখে নারীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, নাচ-গানে মাতোয়ারা শিশু-কিশোর আর ভক্তদের কণ্ঠে দেবীর জয়ধ্বনি। উৎসবের এমন রঙিন আবহের মধ্যদিয়ে বিজয়া দশমীতে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন স্থানে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। গতকাল বুধবার সকালে পূজা-অর্চনা ও সিঁদুর খেলা, বিকেলে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব। চুয়াডাঙ্গা সদর, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দিনভর ছিল উৎসবের আমেজ। কোথাও ঢাকের তালে নাচ-গান, কোথাও সিঁদুর খেলায় মেতেছেন নারীরা, আবার কোথাও প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন ভক্তরা। তবে উৎসবের শেষ মুহূর্তে আনন্দের সঙ্গে মিশে যায় বিদায়ের বিষাদ। অশ্রুসজল চোখে দেবীকে বিদায় জানিয়ে ভক্তরা প্রত্যাশা করেন, আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন মা দুর্গা।
সিঁদুর খেলা, শোভাযাত্রায় মুখর শহর:
বিজয়া দশমীর সকালে বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দশমীর বিহিত পূজা শেষে শুরু হয় অঞ্জলি ও সিঁদুর খেলার আনুষ্ঠানিকতা। বিবাহিত নারীরা একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন, মিষ্টিমুখ করান এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উৎসবে যোগ দেন শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী মানুষ। বিকেলে চুয়াডাঙ্গা বড়বাজার সার্বজনীন দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গণে কয়েকটি মন্দিরের প্রতিমা একত্র করা হয়। পরে প্রতিমা নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহীদ আবুল কাশেম সড়ক, কবরী রোড, কলেজ রোড, কোর্ট মোড়, পুরাতন হাসপাতাল সড়ক, বড়বাজার ও শহীদ হাসান চত্বর ঘুরে ফেরিঘাট সড়কসংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদীর তীরে পৌঁছায়। এছাড়া শহরের বিভিন্ন মন্দির থেকেও প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। কোথাও নৌকায় প্রতিমা নিয়ে নদীতে শোভাযাত্রা করেন ভক্তরা। সড়কের দুই পাশে প্রতিমা দেখতে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। অনেকে মুঠোফোনে উৎসবের মুহূর্ত ধারণ করেন, কেউ আবার ঢাকের তালে নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।
নদীতে প্রতিমা বিসর্জন:
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে মাথাভাঙ্গা নদীর তীরে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় রীতি মেনে একে একে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এসময় দেবীর জয়ধ্বনি ও ‘আসছে বছর আবার হবে’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নদীর তীর। কয়েক দিনের আরাধনা শেষে দেবীকে বিদায় জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেক ভক্ত। এদিকে, সরোজগঞ্জের কাছারিপাড়া পূজামণ্ডপের প্রতিমা নবচিত্র নদে এবং বোয়ালিয়া এলাকার প্রতিমা নবগঙ্গা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে এসব বিসর্জন ঘিরে নদীর তীরে ভিড় করেন স্থানীয় ভক্ত ও দর্শনার্থীরা।
দামুড়হুদায় ২০ মণ্ডপে উৎসব:
দামুড়হুদা উপজেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে দুর্গোৎসব। উপজেলার ২২টি মণ্ডপের মধ্যে এবার ২০টিতে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়া দশমীতে সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়। বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ, আনসার, গ্রাম পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেন। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
দামুড়হুদার চিৎলা শ্রী শ্রী সার্বজনীন পূজামণ্ডপের সভাপতি মদন কুমার হালদার বলেন, ১৬ অক্টোবর থেকে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্যাপন করেছেন তাঁরা। এ সময়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। দামুড়হুদা উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় হালদার বলেন, এবার আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে পেরে তাঁরা সন্তুষ্ট। এ জন্য প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মেসবাহ উদ্দিন বলেন, প্রশাসনের নজরদারিতে সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন বলেন, জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় শান্তিপূর্ণভাবে পূজা সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
জীবননগরেও আবেগঘন বিদায়:
জীবননগর উপজেলাতেও উৎসবমুখর ও আবেগঘন পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি, গান-বাজনা ও সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। পরে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে প্রতিমা বিসর্জন দেন ভক্তরা। উৎসবের শেষ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা ছিল। প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়।
নিরাপত্তায় তৎপর ছিল প্রশাসন:
চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদীর পুরাতন সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিমা বিসর্জন উপভোগ করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। এসময় তিনি সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দুর্গাপূজার মধ্যদিয়ে দেবী দুর্গা সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আসেন এবং পূজা শেষে কৈলাসে ফিরে যান। তাই বিজয়া দশমী একদিকে আনন্দ ও মিলনের, অন্যদিকে বিদায় ও অপেক্ষার দিন। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসব। বিদায়ের বিষাদ পেরিয়ে এখন ভক্তদের অপেক্ষা আগামী শরতের, যখন আবারও ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপ।
