ছবির ক্যাপশন:
‘শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গা জেলা, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগরে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবস-২০২৬ উদ্যাপন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির আয়োজনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের কোর্ট মোড় প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। এতে স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শারমিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম. তারিক-উজ-জামানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ডিসি সাহিত্য মঞ্চে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। পরে গীতাপাঠ করা হয়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাজুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সৌম্যজিতা শ্রুতি।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শারমিন আক্তার বলেন, প্রত্যেককে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। নারীদের চলাচল ও স্বাধীনভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি এবং তাঁদের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, পরিবারে কন্যাশিশুর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম ভিত্তি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। গৃহিণী কিংবা গ্রামাঞ্চলের নারীরাও পতিত জমিতে শাকসবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালনসহ বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কাজের মাধ্যমে আয় করতে পারেন। এতে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি নারীর আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়বে।
আলোচনা সভায় কন্যাশিশুর পক্ষে বক্তব্য দেয় চুয়াডাঙ্গা কালেক্টরেট স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাশরুবা মেহজাবিন মাইশা। সে বলে, বাল্যবিয়ে এখনো কন্যাশিশুর অগ্রগতির অন্যতম বড় বাধা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক মেয়েকে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে দেওয়া হয়। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ব্যাহত হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম. তারিক-উজ-জামান, চুয়াডাঙ্গা পৌর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনি ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। এ ছাড়া মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও জেলা শিশু একাডেমির কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গতকাল সোমবার বেলা ১০টায় উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে র্যালিটি বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে গিয়ে শেষ হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, কন্যাশিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি, যা কন্যাশিশুর স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। এ জন্য সবাইকে সামাজিকভাবে সচেতন হতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন বলেন, আজকের কন্যাশিশুরাই আগামী দিনের নারী নেতৃত্ব দেবে। তাদের আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধে উপজেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সাজ্জাদ হোসেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহা. মশিউর রহমান, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হোসনে জাহান এবং দামুড়হুদা প্রেসক্লাবের সভাপতি শামসুজ্জোহা পলাশসহ অন্য অতিথিরা।
এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা জামায়াতের আমির নায়েব আলী, সেক্রেটারি আবেদ উদ দৌলা টিটন, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত সুধীজন। আলোচনা শেষে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
অপরদিকে, জীবননগর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবারআয়োজিত এ র্যালিতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি। র্যালিতে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকেরা অংশ নেন। এ সময় কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, নিরাপত্তা এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কন্যাশিশুর সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ভূমিকার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, কন্যাশিশুর মতামতের প্রতি সম্মান, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কন্যাশিশুর সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তারাই ভবিষ্যতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
