২১ বছরের মহাকাব্যের সমাপ্তি

আপলোড তারিখঃ 2026-10-08 ইং
২১ বছরের মহাকাব্যের সমাপ্তি ছবির ক্যাপশন:

বুধবার রাতের বুয়েনস আইরেস যেন এক মায়াবী রূপকথার শহর। মাথার ওপরের কালচে আকাশটা হঠাৎ করেই ভেসে গেল হাজারো রঙের আতশবাজির আলোয়। মনুমেন্টালে ঢুকেছেন ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক। সবার চোখ ছিল একজনের দিকে। তিনি লিওনেল মেসি। এই রাতেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামলেন তিনি। প্রতিপক্ষ ছিল বেনিন। কিন্তু রাতটা ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠল একটি জাতির কৃতজ্ঞতার উৎসব।


সন্ধ্যা নামার আগেই শহরের চেহারা বদলে গিয়েছিল। রাজধানীর নানা স্থাপনা আকাশি-সাদা আলোয় সাজানো হয়। মেসির নিজ শহর রোজারিওতে কয়েক ঘণ্টা আগে জাতীয় পতাকা স্মৃতিসৌধে খোলা হয় বিশাল এক ১০ নম্বর জার্সি। তাতে লেখা ছিল ‘গ্রাসিয়াস’, অর্থাৎ ধন্যবাদ। রাস্তায় ছিল অন্যরকম এক আবহ। অনেকটা বিশ^কাপের দিনের মতো। রাজধানীগামী ট্রেনে ভিড় ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম। যারা যাচ্ছিলেন, তাদের বেশির ভাগের গায়ে ছিল আকাশি-সাদা জার্সি বা জ্যাকেট। অনেকে ঘরে বসেই রাতটা কাটাতে চেয়েছেন। সন্ধ্যা গড়াতেই লোকজন ঘরে ফিরতে থাকেন। কারণ সবাই জানতেন, এটাই মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখার শেষ সুযোগ।


মনুমেন্টালে মেসি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন। এই মাঠেই তিনি জাতীয় দলের জার্সিতে সবচেয়ে বেশি ১৯ গোল করেছেন। বিশ^কাপ জয়ের পর উদ্যাপনের জন্যও ফিরেছিলেন এখানেই। বিদায়ের জন্য এর চেয়ে মানানসই মঞ্চ হয় না। প্রতিপক্ষ তুলনামূলক অচেনা হলেও টিকিটের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। তবু গ্যালারি ভরে উঠতে থাকে অনেক আগে থেকেই। দর্শকের আনন্দে ছিল এক ধরনের সংযম। বিশ^কাপ ফাইনালের পর এই প্রথম আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে নামছেন মেসি, আর এটাই শেষ। ওয়ার্মআপে নামার মুহূর্ত থেকেই গ্যালারি তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়।


শোনা যায় ‘এগিয়ে যাও, চ্যাম্পিয়ন’ আর ‘লিও, লিও’ স্লোগান। ইংল্যান্ডবিরোধী সেই পুরোনো গানও ফিরে আসে। গত বিশ^কাপে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর গানটি নতুন করে ছড়িয়েছিল। খেলা শুরুর আগেই আবেগের বাঁধ ভাঙে। দর্শকের ভিড় ঠেলে দলের বাস স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় কান্নায় ভেঙে পড়া মেসির ছবি ধরা পড়ে। জাতীয় সংগীতের সময় চোখ ভিজে যায় মেসি আর কোচ লিওনেল স্কালোনির। মেসির তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও চিরো তখন তার সঙ্গে লাইনআপে ছিল। ১০ মিনিটে খেলা থামিয়ে পুরো স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে করতালি দেয়। বেনিনের খেলোয়াড়েরাও একে একে এসে মেসির হাত ধরে ঝাঁকিয়ে যান। গ্যালারি তখন গাইছিল, মেসির হাত ধরে সবাই মিলে বিজয় উদ্যাপনের গান।


ম্যাচের পর ছিল আরেক আবেগের মুহূর্ত। প্রথমে হয় চোখ ধাঁধানো ড্রোন শো। যদিও বিজ্ঞাপনের বাড়াবাড়ি সেই আনন্দে কিছুটা ছায়া ফেলে। তারপর আর্জেন্টাইন গায়িকা লা সোলে সবাইকে নিয়ে গান গেয়ে মেসিকে অভিবাদন জানান। গানটি ‘ব্রিনদিস’। জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণার ভিডিওর জন্য মেসি নিজেই এই গানের কিছু চরণ বেছে নিয়েছিলেন। গানে স্বপ্ন দেখার কথা ছিল, বিশ্বাস রাখার কথা ছিল। গ্যালারিতে বা টিভির সামনে যারা তখনো কাঁদেননি, তারাও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।


মেসি নিজেও কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করেছেন, যেভাবে প্রতিপক্ষের সামনে বহুবার নিজেকে সামলেছেন। কয়েকবার মুখ ঢাকতে বাধ্য হন। তারপর মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মন থেকে কথা বলেন। শুরুতেই বাবার কথা বললেন, যিনি তার ক্যারিয়ারের এক মূল স্তম্ভ। এরপর খোলাখুলি বললেন ভবিষ্যতের কথা। ‘আর ফিরতে না পারাটা হবে বিশাল কষ্টের,’ বলেন তিনি। জানান, আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা জীবনের সেরা প্রাপ্তি। আরো বললেন, ‘আমি শপথ করে বলছি, সারা জীবন এখানে থাকতে চাই। কিন্তু শেষ বিশ^কাপ ছিল অনেক বেশি কঠিন। আমি এই জার্সি গায়ে খেলাটা ভীষণ মিস করব।’
বিপুল করতালির মধ্যে মেসি সতীর্থদের ধন্যবাদ জানান। অনেক খেলোয়াড়ের চোখে তখন জল। মেসি বলেন, তারাই তাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানিয়েছেন। মাঠের ভেতরে-বাইরে তাদের সঙ্গে থাকা ছিল বিশাল সম্মানের। সমর্থকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান। কাতার বিশ্বকাপের পর এই স্টেডিয়ামে খেলা প্রথম ম্যাচটিকে তিনি জীবনের সেরা ঘটনা বলেন। আজও সেই রাতের ভিডিও দেখেন বলে জানান। শেষে ২০২২ সালের বিশ^চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক পুরো মাঠ ঘুরে সমর্থকদের অভিবাদন জানান।


মেসি জাতীয় দল ছেড়ে গেলেন এমন এক দৃষ্টান্ত হয়ে, যা ফুটবলের সীমা ছাড়িয়ে যায়। রোজারিওর এই সন্তান জয় করেছেন তীব্র প্রতিযোগিতা, বিশাল অর্জন আর মুগ্ধ করা শিল্পের জোরে। সাফল্য আর প্রশংসার মধ্যেও কাজের প্রতি অদম্য নিষ্ঠা তাকে বিভ্রান্ত হতে দেয়নি। তিনি দেখিয়েছেন, সাফল্য মানে চূড়ায় পৌঁছানো নয়, প্রতিটি পতনের পর আবার উঠে দাঁড়ানো। জাতীয় দলের জার্সিতে তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার হলো খেলাটির প্রতি ভালোবাসা, আরামের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসা আর বিপুল খ্যাতির মাঝেও সরল থাকার শিক্ষা। হোমারের নায়কের মতোই বিজয়ের পর ঘরে ফেরা এই মানুষটি ক্যারিয়ার শেষ করলেন এমন এক জাতির মাঝখানে, যারা তাকে ফুটবলের দেবতা হিসেবেই দেখে।

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)