ছবির ক্যাপশন:
‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’ প্রতিপাদ্যে চুয়াডাঙ্গায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি (সুবর্ণজয়ন্তী), শিশু অধিকার দিবস ও বিশ্ব শিশু সপ্তাহ ২০২৬ উদ্যাপন শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশব্যাপী আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন নাহার এবং পুলিশ সুপার মেহেদী শাহরিয়ার।
অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ। এছাড়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি. এম. তারিক উজ জামান, সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমান, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন, পৌর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনি, জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিমসহ জেলা বিএনপির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
দেশব্যাপী আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংযুক্ত থেকে শিশুদের অধিকার সুরক্ষা, নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ এবং শিশুদের শিক্ষা, সুস্থ বিকাশ ও প্রতিভা বিকাশে রাষ্ট্রের বিভিন্ন উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের আগে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী, শিশু অধিকার দিবস ও বিশ্ব শিশু সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কার্যক্রমের বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের অবহিত করা হয়। সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে চিত্রাঙ্কন, দেশাত্মবোধক সংগীত, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এসময় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি (সুবর্ণজয়ন্তী), শিশু অধিকার দিবস ও বিশ্ব শিশু সপ্তাহ ২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এবং সারাদেশে একযোগে তা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উপভোগ করা হয়। উদ্বোধন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো প্রতিভা রয়েছে। তাদের সেই প্রতিভা বিকাশে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, সংগীত ও বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। আমাদের দরকার শুধু তাকে সেই সুযোগটি করে দেওয়া, যার মাধ্যমে সে নিজেকে বিকশিত করতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘শিশুরা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। শিশুরা সঠিকভাবে বেড়ে উঠলে পরিবারের পাশাপাশি দেশের ভিত্তিও শক্তিশালী হবে। আমাদের সব শিশুকে সঠিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারলে আমাদের দেশের ভিত্তিটা অনেক মজবুত হবে।’ প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, শিশুদের যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে তারা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে এবং একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু লেখাপড়ায় ভালো হলেই হবে না। খেলাধুলা, শিল্প, সংস্কৃতি ও সংগীতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও ভালো করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের আজ পড়ালেখার কথা বলব না। আমি বলব, তোমাদের খেলাধুলা করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো শিশু ভালো ছবি আঁকতে পারে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, কেউ গান বা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পছন্দ করে, আবার কেউ নাচ কিংবা কোরআন তিলাওয়াতে পারদর্শী। প্রত্যেক শিশুকে তার পছন্দ ও আগ্রহ অনুযায়ী নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ দিতে হবে।’
তারেক রহমান বলেন, শিশুদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি খেলাধুলার ক্ষেত্রেও সরকার সুযোগ সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের অংশগ্রহণে দেশব্যাপী ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায় থেকে প্রায় ২২ লাখ শিশু (১১ লাখ ছেলে ও ১১ লাখ মেয়ে) ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে।’ এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখা গেলে তাদের মধ্য থেকেই একদিন আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশে ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচি চালু করেছিলেন। বর্তমান সরকার সেই উদ্যোগের পাশাপাশি শিশুদের খেলাধুলার বিকাশেও নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার চায় প্রতিটি শিশু শিল্প, সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলাধুলার ক্ষেত্রে অন্তত একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাক।’ তিনি বলেন, ‘প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুরাও যেন এসব সুযোগ পায়, সে জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই আর্ট, কালচার, স্পোর্টস ও মিউজিকের সুযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করছি।
এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তুতি অনেকটা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ২০২৭ বা ২০২৮ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি শিশুকে তার পছন্দ অনুযায়ী গান শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা বিভিন্ন খেলাধুলার মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের কথা বিবেচনায় শিশুদের বিদেশি ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, ম্যান্ডারিন, জার্মান ও জাপানিসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ শিশুদের জন্য সৃষ্টি করা হবে। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের জন্য যারা বিদেশে যাবে, তাদের জন্য একটি তৃতীয় ভাষা জানা অত্যন্ত সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাড়তি সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।’
শিশুদের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু পড়াশোনা, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি কিংবা একাধিক ভাষা জানলেই একজন মানুষ সম্পূর্ণ হয় না, তাকে মানবিক হতে হবে। তিনি বলেন, ‘তোমাদেরকে মানবিক হতে হবে। এই দেশের প্রকৃতি, পশুপাখির প্রতিও তোমাদের মানবিক হতে হবে।’ তিনি শিশুদের গাছপালা ও পশুপাখির যত্ন নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি গাছকে শিশুর মতো যত্ন করে বড় করে তুলতে হবে। একইভাবে আশপাশের পশুপাখির প্রতিও সহানুভূতিশীল হতে হবে। আমরা যদি প্রকৃতির প্রতি সদয় হই, অবশ্যই প্রকৃতিও আমাদের প্রতি সদয় হবে।’
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে শিশুদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাস্তাঘাটে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কোনো বড় মানুষকে যত্রতত্র ময়লা ফেলতে দেখলে বিনয়ের সঙ্গে তাঁকে সঠিক স্থানে ময়লা ফেলার কথা বলতে শিশুদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শিশুদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তুমি ছোট হিসেবে তাঁকে বলতে পারো—ময়লাটি সঠিক জায়গায় ফেলুন। আপনি যদি পরিবেশ নষ্ট করেন, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। আমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানে বাংলাদেশের লাখো-কোটি শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।’ অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্তানদের মধ্যে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, দেশকে গড়ে তোলার দায়িত্ব সবার। ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালালে একটি পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, মানবিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। পরিবেশনায় অংশ নেওয়া শিশুদের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও ফটোসেশনে অংশ নেন তিনি। এ সময় শিশুদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর শিশুদের আঁকা ছবি ও ফটো গ্যালারি পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শিশু জাদুঘর ভবনে যান এবং ভবনের নিচতলায় সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশন উদ্বোধন করেন। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে পৌঁছালে ১৫০ শিশু তাঁকে বরণ করে নেয়। পরে জাতীয় সংগীতের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।
চুয়াডাঙ্গায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী, শিশু অধিকার দিবস ও বিশ্ব শিশু সপ্তাহ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা, তাদের মেধা ও প্রতিভার বিকাশ এবং নিরাপদ, সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা, তাদের মেধা ও প্রতিভার বিকাশ ঘটানো এবং নিরাপদ, সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জন্য এমন সৃজনশীল ও সচেতনতামূলক আয়োজন তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
