জীবননগরে ১২৪টি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের ৯১টিরই নেই ডিলিং লাইসেন্স, প্রকৃত লেনদেন গোপনের অভিযোগ

ভাউচার ছাড়াই কোটি টাকার লেনদেন, বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

আপলোড তারিখঃ 2026-09-16 ইং
জীবননগরে ১২৪টি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের ৯১টিরই নেই ডিলিং লাইসেন্স, প্রকৃত লেনদেন গোপনের অভিযোগ ছবির ক্যাপশন:

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বছরের পর বছর ধরে লাইসেন্স ছাড়াই চলছে অধিকাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান। উপজেলা জুয়েলার্স সমিতির অধীনে থাকা ১২৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯১টিরই নেই জেলা প্রশাসকের ডিলিং লাইসেন্স। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশের নেই ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ও টিআইএন। ফলে একপ্রকার নিয়ম-নীতির বাইরে থেকেই ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।


শুধু লাইসেন্স না থাকাই নয়, এসব প্রতিষ্ঠানে সোনা কেনাবেচার ক্ষেত্রে ভাউচার, মেমো কিংবা নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ না করারও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দোকানভেদে প্রতি মাসে কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকার লেনদেন হলেও অনেকেই প্রকৃত লেনদেনের ওপর ভ্যাট দেন না। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জীবননগর উপজেলা জুয়েলার্স সমিতির অধীনে বর্তমানে ১২৪টি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৯১টি প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসকের ডিলিং লাইসেন্স নেয়নি। এছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স ও টিআইএন নেই। সম্প্রতি সরেজমিনে জীবননগরের কয়েকটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এসব লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের কেউই তা দেখাতে পারেননি। তাদের কেউ কেউ ৭-৮ বছর ধরে ব্যবসা করলেও এখনো প্রয়োজনীয় লাইসেন্স নেননি।


সোনা কেনাবেচার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। অধিকাংশ দোকানে ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো ভাউচার বা মেমো দেওয়া হয় না। এমনকি নিয়মিত হিসাবও খাতায় সংরক্ষণ করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসার প্রকৃত পরিমাণ গোপন রাখা এবং ভ্যাট এড়ানোর জন্যই এমনটি করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।


তবে হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ করেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাদের কেউ কেউ মাসে মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা ফিক্সড চালানের মাধ্যমে ব্যাংকে ভ্যাট জমা দেন। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটির মাসিক লেনদেন কোটি টাকারও বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।


জীবননগর মকছুদ সুপার মার্কেটের ফাতেমা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী ইউনুচ আলী বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই। প্রায় দুই বছর আগে নতুন দোকান দিয়েছি। এতদিন লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করেছি, কোনো সমস্যা হয়নি। এখন সমিতির মাধ্যমে লাইসেন্সের জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।’


একই মার্কেটের নিউ জবা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শ্রী সদানন্দ কর্মকার স্থানীয়ভাবে পাইকারি স্বর্ণ ব্যবসায়ী বা ‘মহাজন’ হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেন, ‘আমরা এভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি, কোনো সমস্যা তো হয়নি।’ কতটুকু স্বর্ণ সংরক্ষণ করা যায়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। যার যেমন সামর্থ্য, সে অনুযায়ী স্বর্ণ সংরক্ষণ করতে পারে।


স্বর্ণ কেনাবেচার বিষয়ে তিনি বলেন, বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা তাদের কাছ থেকে সোনা কিনতে আসেন। আবার তারাই সোনা বিক্রি করে টাকা নিয়ে যান। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সোনা আনা হয় বলেও জানান তিনি। তবে সোনা আমদানি ও কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোনো ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করেন না বলে স্বীকার করেন।


পানবাজারের দত্ত জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শ্রী গৌর দত্ত বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানের সব লাইসেন্স আছে। তবে বাজারের অনেক দোকানেরই নেই। সেখানে খোঁজ নেন। অনেকে অবৈধভাবে সোনার বার আমদানি করেন। খুঁজলেই পাবেন। কয়েক বছর আগের আর এখনকার অনেকের বাড়ি-গাড়ি দেখলেই বিষয়টি বোঝা যাবে।’


জীবননগর উপজেলা জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জুরাইজ হোসেন বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই অধিকাংশ ব্যবসায়ীর কোনো লাইসেন্স নেই। আগের কমিটির সময় থেকেই তারা এভাবে ব্যবসা করে আসছেন। আমরা ভোটের মাধ্যমে কয়েক মাস আগে নির্বাচিত হয়েছি। এরই মধ্যে সবাইকে লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে অনেক ব্যবসায়ী আমাদের কথাও গুরুত্ব না দিয়ে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।’


সমিতির সভাপতি হাজী আশাবুল হক বলেন, ‘আমাদের সমিতির অধিকাংশ সদস্যের ডিসি লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য লাইসেন্স নেই। আমরা সমিতির পক্ষ থেকে তাদের বারবার মৌখিক ও লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পৌরসভায় ট্রেড লাইসেন্সের ফি নিয়ে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা পৌরসভার প্রশাসকের সঙ্গে মিটিং করেছেন। আশা করছি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে। এরপরও কোনো ব্যবসায়ী লাইসেন্স না করলে তার দায়ভার সমিতি নেবে না।’


জীবননগর ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর খালিদ হাসান বলেন, ‘জীবননগরের অধিকাংশ দোকানেই ফায়ার লাইসেন্স নেই। আমরা তাদের বারবার তাগাদা ও সতর্ক করেছি। কিন্তু তারা বিষয়টি সেভাবে আমলে নেয়নি।’ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সোনার গহনা তৈরির  সোনা গলাতে এসিড ও ছোট এলপিজি গ্যাসের বোতল ব্যবহার করা হয়। এতে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।’


এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে আমরা ডাটাবেজ তৈরির নির্দেশনা পেয়েছি। আমরা এটা নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছি।’

চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম তারিকুজ্জামান বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী জুয়েলারি ও জুয়েলারি কারিগর সংশ্লিষ্ট দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান ডিলিং লাইসেন্স সংগ্রহ করেছেন। জুলাইয়ের পর এ অর্থবছরে অনেক লাইসেন্সের আবেদন পড়ছে। আমরা ইউএনওদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স দেয়ার ব্যবস্থা করছি।’


তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনাই আছে, শুধু জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান নয়, অত্যবশ্যকীয় পণ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডাটাবেজের আওতায় নিয়ে আসা। আমরা ইতিমধ্যে জেলার চার ইউএনওকে নির্দেশনা দিয়েছি ডাটাবেজ তৈরি করার জন্য। খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি হয়ে যাবে। তখন তালিকা ধরে ধরে আমরা অভিযানে নামবো, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’


ব্যবসায়ীদের প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণ গোপন রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ভ্যাট এড়ানোর জন্যই এমনটি করে। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। আমি বিষয়টি নোট নিলাম, সামনের মিটিংয়ে আমি এটি উপস্থাপন করব।’

সম্পাদকীয় :

প্রধান সম্পাদকঃ নাজমুল হক স্বপন
ফোনঃ +৮৮০২৪৭৭৭৮৭৫৫৬

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ

বার্তা সম্পাদকঃ শরীফুজ্জামান শরীফ


বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ

অফিসঃ পুলিশ পার্ক লেন (মসজিদ মার্কেটের ৩য় তলা) কোর্ট রোড, চুয়াডাঙ্গা।

ইমেইলঃ dailysomoyersomikoron@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১-৯০৯১৯৭, ০১৭০৫-৪০১৪৬৪(বার্তা-বিভাগ), ০১৭০৫-৪০১৪৬৭(সার্কুলেশন)