ছবির ক্যাপশন:
অপারেশন থিয়েটারের শীতল টেবিলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন মা। কিন্তু অসীম অলৌকিকতায় সেই মৃত মায়ের গর্ভ চিরে পৃথিবীতে এসেছে এক নিষ্পাপ নবজাতক। ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রথম প্রভাতেই যে শিশুটি হারালো তার পরম আশ্রয় মাকে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে প্রসূতি শিল্পী বেগমের (২৮) করুণ মৃত্যুর পর উপজেলা প্রশাসনের তড়িৎ আইনানুগ পদক্ষেপ এবং মাতৃহারা সেই শিশুকে কোলে তুলে নেওয়াÑশিশুর প্রতি মানবিকতায় সৃষ্টি হয়েছে এক হৃদয়বিদারক অথচ প্রশংসনীয় পরিবেশ।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারবাজার এলাকার ‘নিউ গরীবশাহ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’ ভুল চিকিৎসা ও চরম অবহেলার অভিযোগে গতকাল সোমবার দুপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ানা নাহিদ। অভিযানকালে ওই অবৈধ ক্লিনিকটিকে সিলগালা করে দেওয়া হয় এবং প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় মালিকপক্ষকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
ঘটনার বিবরণীতে জানা যায়, গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলার সাতগাছিয়া গ্রামের ইয়ার আলীর স্ত্রী শিল্পী বেগমকে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছিল। অপারেশনের টেবিলেই ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের গাফিলতিতে শিল্পী বেগম মৃত্যুবরণ করেন। তবে চিকিৎসকরা প্রসূতির পেট কেটে জীবিত নবজাতককে বের করতে সক্ষম হন। ঘটনার পর নিহতের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে ক্লিনিক প্রাঙ্গণ এবং ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির প্রাণহানির খবরে পুরো উপজেলায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার মর্মস্পর্শী খবর পেয়ে সোমবার দুপুরে আর ঘরে বসে থাকেননি উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজওয়ানা নাহিদ। সরকারি দাপ্তরিক কঠোরতার ঊর্ধ্বে উঠে এক অনন্য প্রশাসনিক মমত্ববোধ নিয়ে তিনি ছুটে যান মাতৃহারা নবজাতকের নানা বাড়িতে। সেখানে গিয়ে মাতৃহীন শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং আবেগাপ্লুত হন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটির সার্বিক লালন-পালনের জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা, গুড়ো দুধ, নতুন পোশাক এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী উপহার হিসেবে স্বজনদের হাতে তুলে দেন তিনি।
ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ানা নাহিদ কঠোর হুশিয়ারি ও মানবিক অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি নিষ্পাপ শিশু পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার মাকে হারাল- এই ক্ষতি কোনো অর্থ বা সাজা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়েছে এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। বেআইনিভাবে মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করা কোনো ক্লিনিক বা ভুয়া চিকিৎসকদের ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা প্রশাসনিকভাবে শিশুটির পাশে রয়েছি এবং তার নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হবে।’ প্রশাসনের এমন দৃষ্টান্তমূলক কড়া একশন ও মানবিক আচরণকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবার, সুশীল সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষ।
