ছবির ক্যাপশন:
ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও তীব্র বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জোড়া চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে ১০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান এবং ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) রূপান্তর কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য ঘোষণা করে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংকট কাটাতে পাঁচ দফা কর্ম-পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সিসমিক জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালীকরণ, পিএসসি ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।
এছাড়া, বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত প্রসারে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনকারীদের থেকে ১০ দশমিক ৫০ টাকা হারে বিদ্যুৎ কেনার আকর্ষণীয় ঘোষণা এবং শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি এবং ভারত থেকে চুক্তি অনুযায়ী পূর্ণ বিদ্যুৎ না পাওয়ার মতো জটিলতায় যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দৃশ্যমান উন্নতির আশ^াস দিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। যদিও বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ গ্রহণ, এলএনজি ও তেল-কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত অব্যবস্থাপনা দূর করার ওপর জোর দিচ্ছেন।
জ্বালানি সংকট কাটাতে ৫ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে-প্রধানমন্ত্রী:
দেশে চলমান জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণে সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই পাঁচ কর্মপরিকল্পনা হলো- দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সিসমিক জরিপ, বাপেক্সকে শক্তিশালীকরণ, প্রোডাশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট (পিএসসি) ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ। গতকাল বুধবার সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই কর্ম-পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সরকার পাঁচ দফা কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
অধিবেশনের শুরুতে আধা ঘণ্টা সময় নির্ধারিত ছিল প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্ব। এই পর্বে প্রধানমন্ত্রীর জন্য লিখিত প্রশ্ন ছিল আটটি। আধা ঘণ্টা সময়ে চারটি লিখিত প্রশ্ন এবং ছয়টি সম্পূরক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ খনন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চলমান সাতটি কূপ খনন শেষ হলে আরও ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো খননের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে চার হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার টুডি সাইসমিক সার্ভে এবং চার ২০০ বর্গ কিলোমিটার থ্রিডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে তথ্য দেন সরকার প্রধান। প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট বা পিএসসি ও বিডিং প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অফশোর এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৮ সালে এই টার্মিনাল হতে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হবে আশা করছি। ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বৃদ্ধি পাবে। পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ২/১টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন হলে সামগ্রিকভাবে দেশে জ্বালানি সমস্যার সমাধান ও জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।
সংরক্ষিত আসনের আরেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে বর্তমান সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ গত ৬ জুন সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পণ্য যেমন- সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ইত্যাদির ওপর আরোপ করা কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং দুই শতাংশ অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর হতে শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করবেন তাদের সরবরাহ করা বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ দশমিক ৫০ টাকা করে কিনবে বলেও তথ্য দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাল্ক রেটের অতিরিক্ত টাকা সরকার প্রণোদনা হিসেবে দেবে। ফলে গড়ে উৎপাদন মূল্য ছয়-সাত টাকা প্রতি ইউনিট হিসেবে ৪৫ শতাংশ (৪০ শতাংশ মুনাফা ও পাঁচ শতাংশ প্রিমিয়াম) পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদকে বলেন, দেশের সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের ছাদে সোলার সিস্টেম স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থাসমূহকে ইতোমধ্যে বিশেষ বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ইতোমধ্যে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। সোলার ছাড়াও পানি বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি উক্ত কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে।
১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে-সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী:
আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, আগস্টে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে মানুষ যে দুর্ভোগে পড়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে যাতে তার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সংসদে দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধী দলের সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, নিছক কথামালার আড়ালে প্রকৃত সত্যকে লুকাতে চাই না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহের কারণে কষ্টে আছে।’ বর্তমান সংকটকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের ভুল নীতির অনিবার্য পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট নতুন করে চাপ তৈরি করেছে বলেও জানান তিনি।
